https://newsbdc.com/national/mv7m5qje7s
চার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ দেবে সরকার
রাজধানীর চারটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। এসব রোগীর চিকিৎসা, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় সরকারি অর্থে মেটানো হবে। এর মাধ্যমে একদিকে বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর চাপ কমানো, অন্যদিকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত হাসপাতালগুলো হলো শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইমপালস হাসপাতাল, শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। পরে প্রকল্পের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে রোগীপ্রতি বরাদ্দ, চিকিৎসাসেবার মূল্য নির্ধারণ এবং হাসপাতালগুলোর বিল পরিশোধের পদ্ধতি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। রোগী রেফারাল, পরিবহন ও জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে।
কেন এই উদ্যোগ
স্বাস্থ্য বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিপরীতে, নির্বাচিত কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শয্যা খালি থাকে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যমান বেসরকারি হাসপাতালের অব্যবহৃত শয্যা কাজে লাগানো গেলে নতুন হাসপাতাল নির্মাণের তুলনায় কম সময়ে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে রোগী কম থাকায় যেসব মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন না, তাঁদেরও উপকার হবে।
আরও পড়ুন
নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান, আটক ৫৬ জন ১২ ঘণ্টা আগে
শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ সামলাতে তাঁদের হাসপাতালে রোগী পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে এবং সরকার বিল পরিশোধ করবে।
চার হাসপাতালের সক্ষমতা যাচাই
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৫০০, ইমপালস হাসপাতালে ৪০০, শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০০ এবং ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০০ শয্যা রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাসপাতাল নির্বাচনের ক্ষেত্রে চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের একটি দল হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে সক্ষমতা যাচাই করেছে।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন বলেন, কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অবকাঠামো ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও রোগীর সংখ্যা কম। ফলে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত রোগী দেখে ব্যবহারিক শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পান না।
আরও পড়ুন
বসিলায় ৪০ ফিট খাল পরিষ্কার, অভিযানে অংশ নিলেন ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক ১২ ঘণ্টা আগে
তিনি বলেন, মেডিকেল শিক্ষার মানদণ্ড অনুযায়ী ১০০ শিক্ষার্থীর জন্য ৫০০ শয্যার হাসপাতাল থাকা প্রয়োজন। তবে শুধু শয্যা ও অবকাঠামো থাকলেই হবে না, পর্যাপ্ত রোগীও থাকতে হবে।
সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ
স্বাস্থ্য বিভাগ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্ধারিত শয্যাসংখ্যা ২ হাজার ৬০০। এর বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ বেশি।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, নতুন করে ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণে কয়েক বছর সময় এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে। সে তুলনায় বিদ্যমান বেসরকারি হাসপাতালের অব্যবহৃত শয্যা ব্যবহার করে দ্রুত চিকিৎসাসেবার পরিসর বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
কীভাবে রোগী পাঠানো হবে
খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালের সমন্বয় থাকবে। কোন রোগীকে কখন এবং কী প্রক্রিয়ায় বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে, তা নীতিমালায় নির্ধারণ করা হবে।
আরও পড়ুন
সাকের হত্যার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ, চিকিৎসক সাময়িক বরখাস্ত ১৩ ঘণ্টা আগে
পরিকল্পনায় হাসপাতালের শয্যা ভাড়া, কনসালট্যান্ট ফি, সরকার নির্ধারিত ওষুধ এবং সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় বহনের কথা রয়েছে। মাস শেষে চিকিৎসাসেবার হিসাব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে বিল পরিশোধ করা হবে।
তবে রোগী কীভাবে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে যাবেন, পরিবহনের দায়িত্ব কার হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব কীভাবে বণ্টন করা হবে—এসব বিষয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, কোন কোন হাসপাতাল থেকে সেবা নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন রোগী পাঠানোর প্রক্রিয়া, চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের সুযোগের পরিধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নীতিমালা তৈরি হচ্ছে।
সফটওয়্যারে নজরদারির পরিকল্পনা
সরকারি অর্থে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম ঠেকাতে পুরো প্রক্রিয়া সফটওয়্যারনির্ভর করার পরিকল্পনা রয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, রোগী রেফারাল, হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ছাড়পত্রের প্রতিটি ধাপ সফটওয়্যারে নথিভুক্ত থাকবে।
পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালের কার্যক্রম তদারকিতে সাত সদস্যের পর্যবেক্ষণ কমিটি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের নজরদারি চালু হলে ভুয়া রোগী দেখানো, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা অতিরিক্ত বিল করার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
আরও পড়ুন
ফরিদপুরে যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের সংঘর্ষ, প্রাণ গেল ৩ জনের ১৩ ঘণ্টা আগে
হাসপাতাল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন
নির্দিষ্ট চারটি হাসপাতাল নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান বলেন, কয়েকটি হাসপাতাল সরাসরি বেছে নেওয়ার পরিবর্তে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে হাসপাতাল নির্বাচন করা উচিত। চিকিৎসার মান, জনবল ও অবকাঠামো মূল্যায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।
কোন হাসপাতাল কী ধরনের রোগী নিতে পারবে, চিকিৎসার মান কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং কোন সেবার জন্য সরকার কত টাকা দেবে—এসব বিষয়ও আগেই স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কার্যকর তদারকি না থাকলে প্রকৃত রোগীর চেয়ে বেশি রোগী দেখানো, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো কিংবা চিকিৎসার ব্যয় বাড়িয়ে বিল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ কারণে রোগী রেফারাল থেকে ছাড়পত্র পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ যাচাইযোগ্য রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি অবকাঠামো ব্যবহারের প্রশ্ন
আরও পড়ুন
ইতালি, গ্রিস ও সাইপ্রাস থেকে ফেরত ৩৫ বাংলাদেশি ১৩ ঘণ্টা আগে
বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ব্যবহারের আগে সরকারি অব্যবহৃত অবকাঠামো পুরোপুরি কাজে লাগানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ ক্ষেত্রে ডিএনসিসি কভিড-১৯ হাসপাতালের উদাহরণ দিয়েছেন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। করোনাকালে তৈরি হওয়া হাসপাতালটিতে এক হাজার শয্যা ও ২১২টি আইসিইউ সুবিধা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বেসরকারি হাসপাতালে সরকারি অর্থ ব্যয়ের আগে বিদ্যমান সরকারি অবকাঠামোকে পূর্ণাঙ্গ সাধারণ হাসপাতালে রূপান্তরের সম্ভাবনাও যাচাই করা প্রয়োজন।
ঢাকার বাইরে চিকিৎসাসেবা বাড়ানোর তাগিদ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন ও অধ্যাপক বেনজির আহমেদের মতে, শুধু ঢাকার হাসপাতালগুলোর চাপ কমানোর উদ্যোগ নিলে সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জরুরি চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ কমাতে প্রাথমিকভাবে চারটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শয্যা খালি থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, রোগীদের সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে খরচ ভাগাভাগির একটি ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা চলছে। আর্থিক কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর পাইলট প্রকল্পটি শুরু হবে। প্রকল্পের ফল সন্তোষজনক হলে পরবর্তী সময়ে এর পরিসর বাড়ানো হতে পারে।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।