https://newsbdc.com/international/mv6ft5v46m
মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের জিডিপিতে যোগ হতে পারে ১৪০ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি বিশ্ববাণিজ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি বাড়ানো, নতুন বাজার খুঁজে বের করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ করছে ভারত। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব চুক্তি কার্যকর হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অতিরিক্ত প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হতে পারে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি উৎপাদন খাতে সংস্কার, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং শ্রমশক্তিকে আরও উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করতে পারলে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় ফেরার পর দেশটির গড় শুল্কহার বেড়েছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের আগস্টে বেড়ে ১০ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। শুল্ক বৃদ্ধির কারণে দেশটির আমদানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ বাণিজ্য চুক্তি করছে বা বিদ্যমান চুক্তির পরিধি বাড়াচ্ছে। ভারতও নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে এই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন
‘সম্পূর্ণ সুস্থ’ মোজতবা খামেনি, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের দাবি ১১ ঘণ্টা আগে
একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মডেলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা ভারতীয় পণ্যের ওপর গড় শুল্কহার ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছায়। এর ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমতে পারে।
তবে ভারতের মোট উৎপাদনের ২ শতাংশেরও কম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অন্যান্য দেশে রপ্তানি বাড়াতে পারলে মার্কিন শুল্কের প্রভাব অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভারতের মুক্তবাণিজ্য চুক্তিগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—শুল্ক কমানো, বাণিজ্য বাধা হ্রাস এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
আরও পড়ুন
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ১৫ দাতার অনুদান ১৮ হাজার কোটি টাকা, শীর্ষে ইলন মাস্ক ১২ ঘণ্টা আগে
প্রথমত, প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলো প্রথম বছরেই ভারতীয় পণ্যের ওপর সব শুল্ক তুলে নেবে। ভারতও শিল্পপণ্যের ওপর শুল্ক বাতিল করবে। কৃষিপণ্যের শুল্ক অর্ধেক কমানো হবে, যার অর্ধেক প্রথম বছরে এবং বাকি অংশ পরবর্তী ১০ বছরে কার্যকর হবে।
দ্বিতীয়ত, আগামী ১৫ বছরে পণ্য ও পরিষেবা খাতে অশুল্ক বাধার কারণে সৃষ্ট ব্যয় ধাপে ধাপে ২৫ শতাংশ কমবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। এতে বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা কমার পাশাপাশি পরিষেবা খাতেও সুবিধা তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আওতায় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়লে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থার (ইএফটিএ) সঙ্গে চুক্তির আওতায় ১৫ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই অতিরিক্ত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আরও পড়ুন
চাম্পির তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড পূর্ব এশিয়া, বাতিল ৯০০-র বেশি ফ্লাইট ১৪ ঘণ্টা আগে
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইতোমধ্যে কার্যকর মুক্তবাণিজ্য চুক্তিগুলোর কারণে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর হলে এই প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। এতে দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে আরও শূন্য দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হতে পারে। পাশাপাশি ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ ও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা সফল হলে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
চলমান ও পরিকল্পিত সব চুক্তি কার্যকর হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের জিডিপি বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় ১৭০ বিলিয়ন ডলার বা ২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি হতে পারে। একই সময়ে দেশটির রপ্তানি বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন
রোগীদের ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার আশ্বাস হাইকমিশনারের ১৫ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির আওতায় কিছু পণ্যের শুল্ক কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, গাড়ি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মোট শুল্কহার ১৫ শতাংশে নামতে পারে। তবে বেশির ভাগ আওতাভুক্ত পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ ধাতব শুল্ক এবং ১০ শতাংশ ধারা ৩০১-এর শুল্ক বহাল থাকার কথা বলা হয়েছে। চুক্তিটির লক্ষ্য দুই দেশের বাণিজ্যিক উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা কমানো।
মুক্তবাণিজ্য চুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সংস্কারও জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এ জন্য করপোরেট কর কমানো, ভর্তুকি দেওয়া, অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মডেল অনুযায়ী, উৎপাদন খরচ প্রায় ২ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হতে পারে।
এ ছাড়া জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদক্ষেপ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় ভারতীয় উৎপাদকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
আরও পড়ুন
সৌদির দিকে ধেয়ে যাওয়া ১২ ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস ১৬ ঘণ্টা আগে
ভারতের ৪০ শতাংশের বেশি কর্মী কৃষিতে নিয়োজিত। গত এক দশকে এই হার প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। বিপরীতে, দ্রুত শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামে কৃষিশ্রমিকের হার ৪০ শতাংশের বেশি থেকে কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে দেশটিতে মাথাপিছু কৃষি উৎপাদন ভারতের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতেও ধাপে ধাপে কৃষিশ্রমিকদের উৎপাদন ও পরিষেবা খাতে কাজের সুযোগ তৈরি করা গেলে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে। এতে ২০৩৫ সালের মধ্যে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ১ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি শিল্পোন্নয়ন, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির মতো অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যকর করতে পারলে ভারত দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন গতি পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও সঠিক কৌশল ও সংস্কারের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতিকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।