https://newsbdc.com/education-study/mw0858synl
এইচএসসিতে শূন্য পাস ২৯৩ প্রতিষ্ঠান, এমপিও বাতিলের চিন্তা সরকারের
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া শুরু হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাব পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড। সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে পরপর দুবার বা তার বেশি শূন্য পাস করা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত বা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনাও করছে সরকার।
গত শনিবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এবার পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা বিগত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় এবার ২৯ হাজার ১৩ জন শিক্ষার্থী কম জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। ফলাফলের এই অবনতির সঙ্গে বেড়েছে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। এবার এ সংখ্যা ২৯৩টি, যা গত বছর ছিল ২০২টি। অর্থাৎ, গতবারের তুলনায় এবার শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৯১টি।
এর আগে ২০২৪ সালে ৬৫টি, ২০২৩ সালে ৪২টি, ২০২২ সালে ৫০টি এবং ২০২১ সালে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। সেই হিসাবে ছয় বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ২৮৮টি।
আরও পড়ুন
শিক্ষার আধুনিকায়নে এআই ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর তাগিদ শিক্ষামন্ত্রীর ১৮ ঘণ্টা আগে
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, সেগুলোর অধিকাংশই কাগুজে প্রতিষ্ঠান। শিক্ষক ও অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষার্থী নেই। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান নন-এমপিওভুক্ত, যেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষকও নেই। ফলে বেশির ভাগ শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন না থাকলেও কিছু লোক মিলে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য থাকে, কয়েক বছর পর প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলে চাকরি নিশ্চিত করা। উত্তরবঙ্গে এ চর্চা বেশি। পড়াশোনা করানোর প্রতি আগ্রহ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী আসে না। এলেও ভালো ফল করতে পারে না।
আরও পড়ুন
জবির দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের বাজেট পাসে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব: হুইপ অপু ১৮ ঘণ্টা আগে
শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত নওগাঁর পত্নীতলা সরকারি টেকনিক্যাল কলেজ থেকে চলতি বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১০ জন পরীক্ষার্থী। তাঁদের জন্য কলেজটিতে কর্মরত রয়েছেন ১৭ জন শিক্ষক। তবে ওই ১০ পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেননি।
কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগই অনিয়মিত। তারা পড়াশোনার পাশাপাশি কারখানা কিংবা দোকানে কাজ করে। তাদের ধরে ধরে এনে ক্লাস করাতে হয়। এ কারণে এখানকার ফলাফল এত খারাপ।’
একইভাবে নেত্রকোনা জেলা সদরে অবস্থিত নন-এমপিওভুক্ত ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন কলেজ থেকে টানা দুই বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি। চলতি বছর এ কলেজ থেকে চারজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও তাঁদের কেউ পাস করতে পারেননি। এর আগের বছরও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই শিক্ষার্থীর কেউ উত্তীর্ণ হননি।
আরও পড়ুন
বিশ্ববিদ্যালয় হবে গবেষণা ও মুক্তচিন্তার কেন্দ্র: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২৩ ঘণ্টা আগে
কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইকবাল হাসান তপু বলেন, ‘এটি নন-এমপিও কলেজ। এখানে কোনো নিয়মিত শিক্ষক নেই। যখন যাকে প্রয়োজন, ডেকে আনা হয়। সরকারের কোনো সুযোগ-সুবিধাও এখানে নেই।’
এ ছাড়া গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ফকিরহাট মহিলা কলেজ ও সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ী মহিলা কলেজ থেকে এবার কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি। এর মধ্যে ফকিরহাট মহিলা কলেজ থেকে দুজন এবং জুমারবাড়ী মহিলা কলেজ থেকে একজন পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। গত তিন বছর ধরে ফকিরহাট মহিলা কলেজের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারছেন না।
ফকিরহাট মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবার রহমান রশিদ বলেন, ‘এ বছর মানবিক বিভাগ থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে দুজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের কেউ পাস করেনি। ২০০০ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত শুধু পাঠদানের অনুমোদন পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি আজ পর্যন্ত এমপিওভুক্ত হয়নি। অনেক শিক্ষকই এমপিওর আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তাই তারা প্রতিষ্ঠানে আসেন না। তাদেরও তো সংসার আছে। বিনা বেতনে কতদিন পড়াবেন। এ কারণে ফলাফল ভালো করা সম্ভব হচ্ছে না।’
আরও পড়ুন
এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়, ৮০ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য ২ নভেম্বর ২০২৬
তবে এসব অপরিকল্পিত প্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার চিন্তাও রয়েছে সরকারের। শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করে কাছাকাছি অবস্থিত অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত বা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তবে এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেগুলো রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে সীমিত পরিসরে কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিন্যাস করা যায়, তা নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে। শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সেগুলোকে কাছাকাছি অবস্থিত অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের চাকরি বহাল থাকবে।’
আরও পড়ুন
শিগগিরই নতুন পে স্কেলের আওতায় আসবেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা: শিক্ষামন্ত্রী ১ নভেম্বর ২০২৬
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর জন্য আজ চিঠি দেওয়া হবে। বিগত পাঁচ বছরের শিক্ষার্থী, পাসের হার ও শিক্ষকদের তথ্য নিয়ে আসতে বলা হবে। তাদের জবাবের পর এক সপ্তাহের মধ্যে একাধিকবার শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করব।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘দুবারের বেশি যেসব এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি, তাদের এমপিও বাতিল করার চিন্তা রয়েছে। আর নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিও দেওয়া হবে না। এ ছাড়া অপরিকল্পিত প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করে পাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।’
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এইচএসসি পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি কিংবা পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।