https://newsbdc.com/education/mvysria1cz
এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়, ৮০ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য
উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে। এবারের পরীক্ষায় ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং হিসাববিজ্ঞানসহ কয়েকটি বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব, অনিয়মিত পাঠদান এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরীক্ষার ফলেও।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের দুই হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য রয়েছে। এমপিওভুক্ত বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পদের সংখ্যা ৭৭ হাজার ২২৭। অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের জন্য মোট ৮০ হাজার ৬৯টি শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে।
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটের চিত্রও উদ্বেগজনক। দেশের তিন হাজার ৮৬১টি বিদ্যালয়ে কোনো আইসিটি শিক্ষক নেই। দুই হাজার ৬২৫টি বিদ্যালয়ে ইংরেজি এবং দুই হাজার ৭৪৪টি বিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষক নেই। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষকসংকটও রয়েছে। মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ সংকট আরও তীব্র।
আরও পড়ুন
শিক্ষার আধুনিকায়নে এআই ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর তাগিদ শিক্ষামন্ত্রীর ১৩ ঘণ্টা আগে
শিক্ষাবিদদের মতে, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শেখার ভিত্তি দুর্বল থাকলে উচ্চমাধ্যমিকে তার প্রভাব পড়বেই। বিশেষ করে ইংরেজি ও আইসিটির মতো বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য নিয়মিত অনুশীলন, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। কোথাও অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে আইসিটি শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ও ল্যাব সুবিধাও নেই।
গত শনিবার প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত ২২ বছরের মধ্যে এ হার সর্বনিম্ন। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন। ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি দুই লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে এক লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। ফলাফলের এ চিত্র শিক্ষার মান, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফারুখে আযম মু. আবদুস সালাম অবশ্য ফল বিপর্যয়ের বিষয়টি মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘ফল বিপর্যয় হয়নি, সঠিক মূল্যায়ন হয়েছে। আমরা মূলত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করছি। তবে ইংরেজিসহ কয়েকটি বিষয়ে পাসের হার কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধান এবং সমস্যা সমাধানে কাজ করা হবে।’ তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষবিমুখতা ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতার কারণে অনেকে ভালো ফল করতে পারেননি।
আরও পড়ুন
জবির দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের বাজেট পাসে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব: হুইপ অপু ১৩ ঘণ্টা আগে
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করেছেন আইসিটিতে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এ দুটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদানের অভাব এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার প্রবণতা আগে থেকেই বেশি। এবারের প্রশ্নপত্রও গতানুগতিক ধারার ছিল। অন্যদিকে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটির বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে এ বিষয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। আইসিটি বিষয়ে পরীক্ষার্থীরা পাঠ্যসূচিও যথাযথভাবে বুঝতে পারেনি। এ কারণে এ বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে।
তবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি বা পাঠ্যসূচি অনুধাবনের দুর্বলতাকেই একমাত্র কারণ মনে করেন না শিক্ষাবিদেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, দেশে দক্ষ ইংরেজি শিক্ষকের ঘাটতি দীর্ঘদিনের। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ইংরেজি কিংবা আইসিটি পড়ানো হয়। বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এর প্রভাব পরীক্ষার ফলেও পড়ছে।
আইসিটি শিক্ষায় বিদ্যমান বৈষম্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন এই শিক্ষাবিদ। তাঁর ভাষ্য, ঢাকার বাইরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি ল্যাব নেই। গ্রামাঞ্চল ও নিম্ন আয়ের পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত কম্পিউটার বা প্রয়োজনীয় ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগও নেই। ফলে শ্রেণিকক্ষের বাইরে অনুশীলন করতে পারে না তারা। অথচ আইসিটি এমন একটি বিষয়, যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতাও জরুরি। এ সুযোগের অভাব শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন
বিশ্ববিদ্যালয় হবে গবেষণা ও মুক্তচিন্তার কেন্দ্র: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১৭ ঘণ্টা আগে
শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি করোনাকালীন শিক্ষার ক্ষতি, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি, পড়াশোনায় অনাগ্রহ এবং পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যসূচিতে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টিও এবারের ফল খারাপ হওয়ার কারণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, কয়েক বছরের শিখন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার আগেই শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যসূচির পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ফলে তাদের প্রস্তুতির দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে।
তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মাজেদা মুজিব মনে করেন, এবারের ফলাফল শিক্ষার মানের আকস্মিক অবনতির চেয়ে মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রতিফলন বেশি। তাঁর মতে, রাতারাতি একটি পুরো ব্যাচের ফলাফলে এত বড় পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক নয়। একইভাবে এক-দুই বছরের ব্যবধানে শিক্ষার সামগ্রিক মানেও নাটকীয় পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়।
মাজেদা মুজিব আরও বলেন, আগে ভালো ফল দেখানোর প্রবণতা ছিল। এখন শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অর্জন ও গুণগত মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রথম দেখায় এবারের ফল বিপর্যয়কর মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হবে এবং শিক্ষকেরাও পাঠদানের মান উন্নয়নে তাগিদ অনুভব করবেন।
তবে মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনকে ফলাফলের একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দেখতে চান না শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, এবারের খারাপ ফল পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে কোনোভাবেই তা গ্রহণযোগ্য নয়। করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে শিক্ষার মান ধারাবাহিকভাবে কমেছে। একই সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকটও প্রকট হয়েছে।
আরও পড়ুন
শিগগিরই নতুন পে স্কেলের আওতায় আসবেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা: শিক্ষামন্ত্রী ১ নভেম্বর ২০২৬
অধ্যাপক মনজুর আহমদের মতে, এবারের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফল খারাপ হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের এককভাবে দায়ী করা যাবে না। বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা দূর করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সরকারের আগের সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচিতে শিক্ষা উন্নয়ন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষার ৯টি ক্ষেত্র নিয়ে ১১৮টি সুপারিশ করা হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার এখনও সেসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। তাঁর মতে, এবারের ফলাফলে একদিকে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কম অংশগ্রহণের বিষয়টি উঠে এসেছে।
অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে নির্ভুল ও সুষ্ঠু করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এখনও একটি যৌক্তিক ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগের অভাব রয়েছে। গড়ে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত থাকে। অথচ এ বছর পাসের হার ৫২ শতাংশ।
আরও পড়ুন
এইচএসসি ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন শুরু, ফি ১৫০ টাকা ১ নভেম্বর ২০২৬
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, শিক্ষকদের একাগ্রতা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে আন্তরিকতার অভাবও ফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অবহেলাও দায়ী। এবারের ফলে সারা দেশের অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন ও হতাশ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মনিনুর রশিদের মতে, শুধু পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ কিংবা শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করলেই এ সংকটের সমাধান হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শূন্য পদে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি ল্যাব ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিসুবিধা বাড়াতে হবে।
বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি, গণিত ও আইসিটির ভিত্তি শক্তিশালী করতে না পারলে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো ফল প্রত্যাশা করা কঠিন বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।
মনিনুর রশিদ বলেন, শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিখন ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে। এরপর সেই ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ ও পাঠদানের মান উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।