https://newsbdc.com/sara-desh/mw07sgru84
চট্টগ্রাম কাস্টমসে সাইফুলের প্রভাব, নিষিদ্ধ পণ্য খালাসের অভিযোগ
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য চালান খালাসে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে। আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশে মিথ্যা ঘোষণা ও নিষিদ্ধ পণ্য খালাসের চেষ্টা, কনটেইনারের লক পরিবর্তন এবং কাস্টমস কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)।
কালবেলার প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, সাইফুল আলমের প্রতিষ্ঠান এমএসটি ইন্টারন্যাশনালের সহায়তায় খালাসের জন্য আনা একটি পণ্য চালান আটকে বিপাকে পড়েন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। চালানটি সশরীরে পরীক্ষা করতে তাঁদের প্রায় তিন মাসের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। সর্বশেষ পরীক্ষায় ওই চালানে মিথ্যা ঘোষণার পাশাপাশি আমদানি নিষিদ্ধ পাকিস্তানের গৌরী ক্রিম পাওয়া যায়। এ চালান আটকের কারণে সিআইসির তৎকালীন মহাপরিচালককে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এনবিআর এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কাফ করপোরেশন মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি করে খালাসের দায়িত্ব দেয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এমএসটি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম।
আরও পড়ুন
বিচ্ছেদের ২৫ দিনের মাথায় সাবেক স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ ২৩ মিনিট আগে
আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে মিথ্যা ঘোষণার পাশাপাশি আমদানি নিষিদ্ধ পাকিস্তানের গৌরী ক্রিম খালাসের জন্য বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়। এর নম্বর সি-১০৯৮৭৬৬। চালানটি লক করার পর তা পরীক্ষা করতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে সিআইসির। এ সময়ের মধ্যে নানা নাটকীয়তা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাইফুলের পণ্য চালান লক করার কারণে সিআইসির তৎকালীন মহাপরিচালক আবদুর রকিবকে পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে। যদিও এনবিআর এ অভিযোগ মানতে নারাজ। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, সাইফুলের সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যেসব পণ্য চালান খালাস হয়, সেগুলো পরীক্ষা করতে অনেক কর্মকর্তা সাহস পান না। তাঁদের দাবি, সিঅ্যান্ডএফ সভাপতি কমিশনারের কক্ষে গেলে কমিশনার দাঁড়িয়ে তাঁকে প্রটোকল দেন—এমন পরিস্থিতিতে অধীন কর্মকর্তাদের পক্ষে চালান পরীক্ষা করা কঠিন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বন্ধের দিনে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে গিয়ে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তার চেয়ারে বসে ফাইলে সই করার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন সাইফুল। এ ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আরও পড়ুন
শ্রমিক অসন্তোষের নামে নৈরাজ্যের প্রতিবাদে টঙ্গীতে বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি ৪৫ মিনিট আগে
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহা. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে কালবেলা। পরে বিষয়টি উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সূত্র আরও জানায়, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ সাইফুলের সহায়তায় টুথপিক ও স্টেইনলেস স্টিলের আড়ালে প্রসাধনী ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি করা হচ্ছে। নথিতে আমদানিকৃত পণ্যের বিবরণ ছিল কৃষিকাজে ব্যবহৃত পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন, টুথপিক, প্রিন্টিংয়ের হিট ট্রান্সফার পেপার এবং কারখানায় ব্যবহৃত সাধারণ স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল।
তবে সিআইসির কায়িক পরীক্ষায় ভিন্ন পণ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তাদের দাবি, কম শুল্কের পণ্যের আড়ালে চীন ও পাকিস্তান থেকে উচ্চ শুল্কের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রসাধনী, ফেস মাস্ক, অ্যান্টি-এজিং জেল, বিএসটিআই নিষিদ্ধ ক্রিম, লেজার লাইট, গাড়ির দামি ইঞ্জিন পার্টস, বিয়ারিং এবং নাট-বোল্ট আনা হয়েছে।
আরও পড়ুন
যৌন হয়রানির প্রতিবাদে ১০ শিক্ষার্থীকে ক্লাসের বাইরে রাখার অভিযোগ, বিক্ষোভ ২০ ঘণ্টা আগে
এ ছাড়া কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিতে লক করা কনটেইনারের মূল সিল কেটে নিজেদের মতো সিল লাগানোর অভিযোগ উঠেছে সাইফুলের কর্মীদের বিরুদ্ধে। কাফ করপোরেশনের একটি চালানে চীন থেকে সাড়ে ২২ টন সাধারণ টুথপিক আমদানির ঘোষণা থাকলেও পরীক্ষায় মাত্র দেড় টন টুথপিক পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি পণ্যের মধ্যে সাড়ে ১৫ টন পাকিস্তানের গৌরী বিউটি ক্রিম পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সিআইসি। এ ছাড়া ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে ও প্রিমিয়াম সানগ্লাসও পাওয়া যায়। এর বাইরে ঘোষণাবহির্ভূত যৌন উত্তেজক ডিলে স্প্রে পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন শুল্ক কর্মকর্তারা।
অভিযোগের বিষয়ে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, কাফ করপোরেশনের মালিককে তিনি চেনেন না। যে সময় তাঁর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পণ্য চালানটির কাজ করা হয়েছে, তখন তিনি দেশের বাইরে ছিলেন।
আরও পড়ুন
সুন্দরবনে শিকারিদের ফাঁদে দুই হরিণ, জীবিত উদ্ধার ২০ ঘণ্টা আগে
কনটেইনারের লক ভাঙার বিষয়ে সাইফুল আলম বলেন, মূলত পরীক্ষার জন্য কনটেইনারটি খোলা হয়েছিল। পরে কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা তাঁকে জানান, পণ্য চালানে লক রয়েছে। পরবর্তী সময়ে কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে নতুন লক লাগানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে সিআইসির দাবি, জালিয়াতির মাধ্যমে কনটেইনারের লক পরিবর্তন করা হয়েছে।
বন্ধের দিনে কাস্টম কর্মকর্তার অফিসে বসে ফাইলে সই করার অভিযোগও অস্বীকার করেন সাইফুল। যদিও কালবেলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাস্টম কর্মকর্তার চেয়ারে বসে নিজের ফাইলে সই করার ঘটনার ছবি ও তথ্য তাদের হাতে রয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশে শুধু নিষিদ্ধ গৌরী বিউটি ক্রিম কিংবা যৌন উত্তেজক ডিলে স্প্রের চালান খালাসের চেষ্টাই নয়, আরও কয়েকটি চালানে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে সাইফুলের বিরুদ্ধে।
আরও পড়ুন
‘ইশ্, প্রধানমন্ত্রী যদি প্রতি মাসে একবার খুলনায় আসতেন’ ২০ ঘণ্টা আগে
সূত্র জানায়, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘এইচ আর এন্টারপ্রাইজ’ ইঞ্জিন রাবার বুশের ঘোষণা দিয়ে প্রায় ১৩ টন ওজনের আসল ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংয়ের মতো দামি মোটরপার্টস খালাসের চেষ্টা করে। একই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সহযোগিতায় ‘নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান চীন থেকে ২৩ টন হিট ট্রান্সফার পেপার আমদানির ঘোষণা দিয়ে সাড়ে ২১ টন ফ্লেক্স ব্যানার খালাসের চেষ্টা করে। এনবিআরের কর্মকর্তারা তদন্তে এসব জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, এমএসটি ইন্টারন্যাশনাল যেসব প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করে, সেসব পণ্য চালানে লক দেওয়ার সাহস অনেকের নেই। তাঁদের অভিযোগ, সিআইসি লক দেওয়ার পরও সময়মতো চালান পরীক্ষা করতে পারেনি। দফায় দফায় কায়িক পরীক্ষা আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি যে কর্মকর্তার নেতৃত্বে চালানটি লক করা হয়েছিল, তাঁকেও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কর্মকর্তাদের দাবি, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সাইফুলের একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। তাঁর প্রভাবে আরও কিছু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
সারা দেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।