https://newsbdc.com/international/mvdookk4ov
জীবনযাত্রার ব্যয়ের আগুনে উত্তাল ইউরোপ, চার দেশে বিক্ষোভ-সহিংসতা
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসন সংকট ও শিক্ষার খরচ নিয়ে জমে ওঠা ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজপথ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন পুলিশ সদস্য ও বিক্ষোভকারীরা; গ্রেপ্তারও হয়েছেন অনেকে। সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগও আন্দোলনকে জোরালো করছে।
গত শনিবারের বিক্ষোভে সবচেয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় ফ্রান্সে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ যুক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে কিছু বিক্ষোভকারী সরকারি ভবন, বিলাসবহুল দোকান ও সুপারমার্কেটে হামলা চালান। বিভিন্ন স্থানে লুটপাটের পাশাপাশি পুলিশের গাড়ি ও কর্মকর্তাদের ওপরও আক্রমণের ঘটনা ঘটে।
আরও পড়ুন
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘরে তিন দিনের খাবার-পানি রাখার পরামর্শ যুক্তরাজ্যের ৬ মিনিট আগে
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতের ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। মধ্য প্যারিসে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের পরিদর্শনে গিয়ে তিনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন।
রাজধানী প্যারিসের পাশাপাশি মার্সেই, নিস, নান্তেস, বর্দো, লিমোজ, লিলি, তুলুজ ও স্ট্রাসবুর্গেও দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। লিমোজ শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো টাউন হলের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। মার্সেই ও লিলির টাউন হলও ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। লিওঁতে শহরের প্রধান পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
আরও পড়ুন
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়েছে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অক্টোবর ১ ঘণ্টা আগে
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এসব ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে। তবে সহিংসতার পেছনে অর্থনৈতিক অসন্তোষ, শিক্ষার্থীদের দাবি এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড—কোন বিষয়টি কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নির্ধারণে আরও তথ্য প্রয়োজন।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে নতুন করে সংঘর্ষ যুক্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনের মধ্যে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। ব্রাসেলসের পূর্বে লিয়েজ শহরেও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে জলকামান মোতায়েন করা হয়। তবে এসব বিক্ষোভে মোট কত মানুষ অংশ নিয়েছেন, তা জানায়নি পুলিশ।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি ও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে ১০ হাজারের বেশি মানুষ মিছিল করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির বড় শহরগুলোতে বাড়ি কেনা ও ভাড়া নেওয়ার ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ির দাম অর্ধেকেরও বেশি বেড়েছে; নতুন ভাড়ার চুক্তিতেও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আরও পড়ুন
রিয়াদ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সতর্কতা জারি ১ ঘণ্টা আগে
পর্তুগালের পার্লামেন্ট বিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম বলেছেন, সরকার রাজপথের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের নীতিনির্ধারকেরা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান সংকটের রাজনৈতিক মাত্রাও স্পষ্ট করছে।
ইতালির মিলানেও শান্তিপূর্ণ মিছিলের পর পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভের একপর্যায়ে মুখোশধারী ব্যক্তিরা পুলিশের দিকে পাথর ও ইটের টুকরো ছুড়ে মারেন। রাস্তার আসবাব দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ জলকামান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। সংঘর্ষে অন্তত দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে ইতালির সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১১৬ ডলার ছাড়াল, সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ ১ ঘণ্টা আগে
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, বিক্ষোভ করা নাগরিকদের অধিকার হলেও শহরে আগুন দেওয়া বা সম্পত্তি ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই। মিলানের কেন্দ্র-বামপন্থী মেয়র গিউসেপ্পে সালাও বিক্ষোভের পেছনের কারণগুলোকে যুক্তিসংগত বলে উল্লেখ করেছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা ও নগর অবকাঠামোর ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। বোলোনিয়াতেও বিক্ষোভের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চার দেশের ঘটনাগুলোকে একই নেতৃত্ব বা একক আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দেশভেদে দাবির ধরন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনের উচ্চমূল্য, শিক্ষার খরচ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো কিছু অভিন্ন কারণ রয়েছে। এসব চাপ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে এবং সরকারগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
এইচইসি প্যারিস বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইন ও নীতির অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নোর মতে, ফ্রান্সের বাইরে বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভের ঘটনা ইউরোপজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর ধারণা, আগামী দিনগুলোতে আরও কিছু দেশে আন্দোলন জোরালো হতে পারে। তিনি গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় অসন্তোষের প্রাথমিক লক্ষণ থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন। তবে ভবিষ্যতে আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
আরও পড়ুন
‘সম্পূর্ণ সুস্থ’ মোজতবা খামেনি, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের দাবি ২০ ঘণ্টা আগে
ইউরোপের কয়েকটি দেশে আগামী ১২ মাসের মধ্যে নির্বাচন সামনে থাকায় এই অস্থিরতা রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে জনজীবনের ব্যয় কমানো ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি রয়েছে; অন্যদিকে সহিংসতা, লুটপাট ও জননিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে। অর্থনৈতিক অসন্তোষের সমাধান না হলে বিক্ষোভের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সেই অসন্তোষ শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আরও সংঘাতের দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারগুলোর পদক্ষেপ ও আন্দোলনকারীদের আচরণের ওপর।
আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।