ছবি ভিডিও মতামত
সর্বশেষ
বাংলাদেশ

১১১ সুপারিশ ফাইলবন্দি, সড়কে ঝরছে প্রাণ

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ২১
১১১ সুপারিশ ফাইলবন্দি, সড়কে ঝরছে প্রাণ
সংগৃহীত

প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে মানুষ ঘর থেকে বের হন। কিন্তু সবার আর ঘরে ফেরা হয় না। সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ হারান জীবন, কেউ বরণ করেন স্থায়ী পঙ্গুত্ব। স্বজন হারানোর কান্না আর আহত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের মধ্যেই বছর ঘুরে আসে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। সভা-সেমিনার, আলোচনা ও প্রতিশ্রুতির আয়োজন হয়; কিন্তু সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামে না। দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত হলেও প্রতিকারে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়ে গেছে।



সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল সাতটি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করে ১১১টি সুপারিশ দিয়েছিল। এসব সুপারিশে সড়ক, যানবাহন, চালক ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দুর্বলতা মোকাবিলার দিকনির্দেশনা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। বিদ্যমান আইন থাকা সত্ত্বেও তার কার্যকর প্রয়োগ, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারির ঘাটতিতে ঝুঁকিমুক্ত হচ্ছে না সড়ক-মহাসড়ক।


বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। কিন্তু ধারাবাহিক ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে কার্যকর প্রতিকার মিলছে না। তাঁর ভাষায়, “দেশে প্রতিদিন সড়ক ও মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল চললেও সমাধান ও প্রতিকারের বিষয়ে ধারাবাহিক ও সমন্বিত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। দিবস নির্ভরতায় কোনো সমাধান মিলবে না।”

নয় মাসে প্রাণ গেছে চার হাজারের বেশি মানুষের

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৪ হাজার ২৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪ হাজার ১৫৭ জন। আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৩৯১ জন। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই প্রতিদিন গড়ে ১৫ জনের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।


আরও পড়ুন

নারী ফুটবলের বিকাশে কাজ করছে সরকার: মীর শাহে আলম ১১ মিনিট আগে নারী ফুটবলের বিকাশে কাজ করছে সরকার: মীর শাহে আলম

সর্বশেষ বড় দুর্ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গত ২০ অক্টোবর নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায়। আরপি স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হন। আহত হন অন্তত ২৫ জন।


পুলিশ ও আহত যাত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। বাসটির চালক ও সহকারী পেছনের আসনে ঘুমাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। এক যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের যাত্রাবিরতির পর চালকের আসন থেকে মূল চালক উঠে গেলে সুপারভাইজার বাস চালাতে শুরু করেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর বনপাড়ায় পৌঁছালে ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়।


এই দুর্ঘটনা আবারও সামনে এনেছে গণপরিবহনে চালকের দায়িত্ব, কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নিয়োগব্যবস্থার প্রশ্ন। দীর্ঘ সময় বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালানো, বিকল্প চালকের অভাব এবং মালিকপক্ষের অতিরিক্ত ট্রিপ পরিচালনার চাপ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

১৩ বছরে নিহত সোয়া লাখ, পঙ্গুত্ব বরণ প্রায় পৌনে দুই লাখ

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান সড়ক দুর্ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষভাগ পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন।


সংস্থাটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সড়ক পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, বিআরটিএর অনিয়ম এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রভাবকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ানোর উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া সড়ককেন্দ্রিক পরিবহনব্যবস্থার সম্প্রসারণ নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে পারছে না।

আরও পড়ুন

দাম্মাম ও রিয়াদগামী ফ্লাইট ৪ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখবে বিমান ১৫ মিনিট আগে দাম্মাম ও রিয়াদগামী ফ্লাইট ৪ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখবে বিমান


দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও বড় হয়ে উঠেছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিহত বা স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে তাঁর ওপর নির্ভরশীল সদস্যরা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়েন। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা শুধু পরিবহন খাতের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে।

শিশুদের জন্যও নিরাপদ নয় সড়ক

সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু প্রাণ হারিয়েছে।


সংস্থাটির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৯৫৮ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এবং ২ হাজার ৮১২ জন বাস, ট্রাক বা কাভার্ডভ্যানের আঘাতে পথচারী হিসেবে নিহত হয়েছে। এ ছাড়া বাসসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় সংঘর্ষ ও যানবাহন খাদে পড়ে ২ হাজার ১৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের মতে, গ্রামীণ সড়কে বসতবাড়ির কাছ দিয়ে দ্রুতগতির যান চলাচল, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং শিশুদের সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তাঁর বক্তব্য, শিশুদের নিরাপত্তায় সড়ক অবকাঠামো, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা—তিনটি ক্ষেত্রেই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

নিবন্ধিত যান প্রায় ৬৭ লাখ, ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৭। এর মধ্যে মোটরসাইকেল প্রায় ৫০ লাখ। বাস ও মিনিবাস মিলিয়ে নিবন্ধিত যান রয়েছে ৮৭ হাজার ২৮৫টি।

আরও পড়ুন

ই-টিন আছে, রিটার্ন দেননি? সবার জরিমানা ৫ হাজার নয় ২ ঘণ্টা আগে ই-টিন আছে, রিটার্ন দেননি? সবার জরিমানা ৫ হাজার নয়


কিন্তু নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সড়কে চলাচলকারী সব গাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিটের বাইরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যানবাহন চলাচল করছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ গাড়িও সড়কে নামানোর অভিযোগ রয়েছে।


বুয়েটের একটি গবেষণায় সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ২০ শতাংশের জন্য ফিটনেসবিহীন মোটরযানকে দায়ী করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটি, দুর্বল ব্রেক, টায়ারের সমস্যা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাস ও ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে এসব ত্রুটি বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।


এর পাশাপাশি অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন ও ভটভটির অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সড়ক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিআরটিএর হিসাবে এসব যানবাহনের সঠিক নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মহাসড়কে নিষিদ্ধ বা চলাচলের অনুপযোগী যানবাহন প্রবেশ করলে দ্রুতগতির বাস ও ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কাও বাড়ে।

চালকের সংকট, ক্লান্তি ও দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা

দুর্ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চালকের যোগ্যতা ও শারীরিক সক্ষমতা। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ড্রাইভিং লাইসেন্সধারীর সংখ্যা প্রায় ৫৯ লাখ ৪৬ হাজার। তবে ভারী ও মাঝারি বাণিজ্যিক যানবাহন চালানোর উপযোগী প্রশিক্ষিত পেশাদার চালকের ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।


আরও পড়ুন

ঠাকুরগাঁওয়ে ড্রামের নৌকা ডুবে দুই কিশোরের মৃত্যু ২ ঘণ্টা আগে ঠাকুরগাঁওয়ে ড্রামের নৌকা ডুবে দুই কিশোরের মৃত্যু

একই সঙ্গে চালকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নিয়োগের আনুষ্ঠানিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো, রাতভর যাত্রা এবং ঈদ বা অন্যান্য ছুটিতে অতিরিক্ত ট্রিপ পরিচালনার চাপ চালকের ক্লান্তি বাড়ায়। ক্লান্ত চালকের প্রতিক্রিয়ার গতি কমে যায়, ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হতে পারে।


চালকদের দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতাও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ও বিআরটিএর যৌথ উদ্যোগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে পরিচালিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ৫৪১ জন চালকের মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশের দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা পাওয়া যায়। তাঁদের চশমা ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল বলে পরীক্ষার ফলাফলে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া কিছু চালকের ছানি ও অন্যান্য চোখের সমস্যাও শনাক্ত হয়।


ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্পের সমন্বয়কারী শারমিন রহমানের মতে, দূরের সাইনবোর্ড, রাস্তার বাঁক ও বিভাজক স্পষ্ট দেখতে না পারা এবং রাতে আলোর প্রতিফলনে সমস্যা চালকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। এ কারণে পেশাদার চালকদের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সময় যথাযথ চক্ষু পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

আইন আছে, প্রয়োগে ঘাটতি

বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ রয়েছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, বৈধ লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন পরিচালনা, অতিরিক্ত গতি এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিধানও রয়েছে। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে বিভিন্ন অপরাধে এক লাখ ১০ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


তবে শুধু মামলা ও জরিমানা দিয়ে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নিয়মিত যানবাহন পরীক্ষা, চালকের যোগ্যতা যাচাই, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


আরও পড়ুন

মেট্রো স্টেশনে বিমানবন্দরের মতো নিরাপত্তা, বসছে স্ক্যানার ২ ঘণ্টা আগে মেট্রো স্টেশনে বিমানবন্দরের মতো নিরাপত্তা, বসছে স্ক্যানার

কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের মতে, সড়কের নকশা ও নির্মাণ, যানবাহনের নিরাপত্তা, গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের যোগ্যতা, হেলমেট ও সিটবেল্টের ব্যবহার, পথচারীর নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। সড়ক বিভাজক, নিরাপদ পারাপার, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং চালকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

২০২৭ সালের মধ্যে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন

সরকার ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত আইনে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধারকাজে সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য ডিমেরিট পয়েন্ট এবং বারবার অপরাধ করলে দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।


এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সড়ক দুর্ঘটনা মোকাবিলায় নতুন আইনি কাঠামো তৈরি হতে পারে। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সুপারিশ বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ।


জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা অন্তত ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশও এই লক্ষ্য অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু দুর্ঘটনার বর্তমান প্রবণতা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, চালকের ক্লান্তি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।


জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের মূল প্রশ্ন তাই শুধু সচেতনতার বার্তা প্রচার নয়; বরং ২০১৯ সালে দেওয়া ১১১টি সুপারিশের কোনগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনগুলো হয়নি এবং কেন হয়নি—তার স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা। সড়কে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা যেন কেবল একটি দিনের সংবাদ হয়ে না থাকে, সে জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, জবাবদিহি ও সমন্বিত বাস্তবায়ন। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু চালক বা পথচারীর নয়; সরকার, পরিবহন মালিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সড়ক ব্যবহারকারী সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই মৃত্যুর এই মিছিল থামানোর পথ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।

Bangladesh নিয়ে আরও পড়ুন