https://newsbdc.com/opinion/mv985z6kl0
শেষানের উত্তরাধিকার ও ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার সংকট
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলন একটি পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে। যে দেশে টিএন শেষান (তিরুনেল্লাই নারায়ণ আইয়ার শেষান) নির্বাচনী শৃঙ্খলা ও কমিশনের স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, সেখানে কয়েক দশক পর নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে এত বড় বিতর্ক কেন?
অক্টোবরের শুরু থেকে নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের কাছে পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চলছে। সেখানে অবস্থান নেওয়া রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতাদের পুলিশ আটক করলেও পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন। বিরোধীদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষমতাসীন দল সুবিধা পাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের আন্দোলনও এই দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে ধরপাকড়ের পর আটক তরুণ নেতাদের মুক্তি দেওয়া হলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা এসেছে।
ফলে বিষয়টি একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্নও সামনে আসছে।
আরও পড়ুন
মতামত: গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা—কাগজে নীতি, মাঠে বাস্তব ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শেষান কেন প্রাসঙ্গিক?
টিএন শেষান ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। নির্বাচনী আচরণবিধিকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত করে তিনি দেখিয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে প্রয়োগ করলে রাজনৈতিক আচরণেও পরিবর্তন আনা যায়। তাঁর অবদান শুধু কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশাও বদলে দিয়েছিলেন।
কিন্তু প্রত্যাশা বদলানো আর সেই প্রত্যাশা পূরণের স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। শেষান কাঙ্ক্ষিত আচরণের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তী প্রত্যেক নেতৃত্বকে সেই মানদণ্ডের মধ্যে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও জবাবদিহি যথেষ্ট নিশ্চিত করা যায়নি। সেই কারণেই বর্তমান বিতর্ক নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন
মতামত: শহরের ঘনবসতি ও আমাদের নাগরিক দায় ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভালো কাজ একবার করা আর তার ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করা দুটি আলাদা অর্জন। প্রথমটির জন্য ব্যক্তির উদ্যোগ যথেষ্ট হতে পারে। দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন দায়িত্বের স্পষ্টতা, যোগ্য জনবল, পর্যাপ্ত সম্পদ, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত জবাবদিহি। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ভালো কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা।
খারাপ কাজ সব সময় সহজ আর ভালো কাজ সব সময় কঠিন—এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। তবে যেখানে অনিয়মে ব্যক্তিগত লাভ আছে, বাধা কম এবং জবাবদিহি দুর্বল, সেখানে অনিয়ম বারবার ঘটার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। অন্যদিকে, ভালো কাজ করতে গিয়ে যদি একজন ব্যক্তিকেই একা চাপ, বিরোধিতা ও ক্ষতির ঝুঁকি নিতে হয়, তাহলে তাঁর উত্তরসূরি একই পথে হাঁটবেন—এমন নিশ্চয়তা থাকে না।
ভালো আচরণের আহ্বান প্রয়োজন, প্রয়োজন দৃষ্টান্তও। কিন্তু সেই আচরণ টিকিয়ে রাখতে কাজের পরিবেশ এবং পুরস্কার ও জবাবদিহির ব্যবস্থাও বদলাতে হয়। নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়া যদি ব্যক্তিগত বীরত্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে নিরপেক্ষতার ধারাবাহিকতা দুর্বলই থেকে যাবে।
আরও পড়ুন
মতামত: কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে চাই স্বচ্ছ বাজার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রশ্ন
ভারতের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়াও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে একটি কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের সুপারিশের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদালত বলেছিলেন, সংসদ আইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
পরে প্রণীত আইনে প্রধান বিচারপতির জায়গায় প্রধানমন্ত্রী মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে রাখা হয়। ফলে তিন সদস্যের কমিটিতে সরকারের দুই প্রতিনিধির স্থান হয়।
এই ব্যবস্থা চালু হওয়ার কারণে নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পক্ষপাতদুষ্ট বলা যায় না। তবে যাদের নির্বাচনী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করবে কমিশন, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের কমিশনার নিয়োগে কতটা প্রভাব থাকা উচিত—প্রশ্নটি থেকেই যায়। বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন
মতামত: গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর পথ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দায়িত্ব গ্রহণের পর একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে কোনো সরকারের প্রতিনিধি নন, বরং স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা—সেই অবস্থান ঘোষণা করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়াতেও স্বাধীনতার প্রতি আস্থা তৈরির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়
শেষানের সময়েই নির্বাচন কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন সামনে এসেছিল। ১৯৯৩ সালে আরও দুজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বিরুদ্ধে তাঁর আপত্তি আদালতে গড়ায়। ১৯৯৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বহু সদস্যের নির্বাচন কমিশনকে বৈধ ঘোষণা করেন। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব একজন ব্যক্তির নয়, বরং কমিশনের—এই নীতিও তখন স্পষ্ট হয়।
আরও পড়ুন
মতামত: পাড়ার খেলার মাঠ বাঁচানোর দায় ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এই নীতির তাৎপর্য বড়। একজন অসাধারণ নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু স্থায়ী নির্ভরতার জায়গা হতে হবে প্রতিষ্ঠানের কার্যপদ্ধতি। কমিশনের সদস্যদের মতামত কীভাবে বিবেচিত হবে, সিদ্ধান্ত কীভাবে নথিবদ্ধ হবে, অভিযোগের জবাব কত দিনের মধ্যে দেওয়া হবে এবং ভুল হলে সংশোধন কীভাবে হবে—এসব বিষয় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
তাই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি আরও গভীর প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা দরকার। একজনের পরিবর্তে আরেকজন এলেই কি একই ধরনের সমস্যা ফিরে আসা ঠেকানো যাবে? অভিযোগ সত্য হলে দায় নির্ধারণ কীভাবে হবে? ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের অধিকার ফিরিয়ে দিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? একই সঙ্গে দেখতে হবে, কোন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এমন পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্যও এ অভিজ্ঞতা শিক্ষণীয়। আমরা প্রায়ই ভালো মানুষ খুঁজি, কিন্তু ভালো কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম ভাবি। অথচ ভালো কাজের প্রথম সাফল্যের পরই সতর্কতার নতুন দায়িত্ব শুরু হয়। নিয়মিত দেখতে হয়, ভালো চর্চা টিকে আছে কি না, কোথায় বিচ্যুতি ঘটছে এবং তা সংশোধন করা হচ্ছে কি না।
টিএন শেষান দেখিয়েছিলেন, একজন মানুষ কতটা পরিবর্তন আনতে পারেন। এখন প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে পরবর্তী দায়িত্বশীল ব্যক্তিও সেই মানদণ্ড মেনে কাজ করতে উৎসাহিত ও বাধ্য হবেন। ভালো কাজের প্রকৃত স্থায়িত্ব বোঝা যায় মানুষ বদলে যাওয়ার পরও সেই কাজ অব্যাহত থাকছে কি না, তা দিয়ে।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।