https://newsbdc.com/national/mvmr4zb5fm
দেশের সীমান্তে সক্রিয় ৪ হাজার ৮৩৯ চোরাকারবারি
দেশের সীমান্তজুড়ে সক্রিয় রয়েছে চোরাকারবারিদের বড় নেটওয়ার্ক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি উপেক্ষা করে প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার থেকে মাদক, অস্ত্র, গবাদিপশুসহ বিভিন্ন পণ্য চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মানব ও সোনা পাচারকারীদের তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে, দেশের ৩৮টি জেলায় ৪ হাজার ৮৩৯ জন চোরাকারবারি সক্রিয় রয়েছে। তারা দুর্গম স্থলসীমান্ত ও সমুদ্রপথ ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ পণ্য পাচারে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো সীমান্তপথ দিয়ে বেশি আসছে মাদক, কোনোটি দিয়ে গবাদিপশু, আবার কোনোটি দিয়ে অস্ত্র। আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র স্থানীয় দরিদ্র মানুষকে প্রলোভনে ফেলে এসব কাজে যুক্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভৌগোলিক জটিলতা ও কাঁটাতারবিহীন দুর্গম সীমান্তকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র নতুন নতুন কৌশলে তৎপর রয়েছে। ফলে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি এখন সিন্থেটিক মাদকও আনা হচ্ছে। সীমান্তে সক্রিয় এসব চক্রকে আইনের আওতায় আনা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এ বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে বাহিনীকে নানা বাস্তব ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তবে স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসেবে থার্মাল ইমেজিং, নাইট ভিশন ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। নতুন কোনো রুটের খবর পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, বিজিবির তৎপরতার কারণে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার অবৈধ চোরাচালানের পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এ সময়ে ১ হাজার ৬০৩ জন চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের জন্মদিন আজ ১ ঘণ্টা আগে
চোরাকারবারিদের ধরনভিত্তিক চিত্র
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, দেশের সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় ৪ হাজার ৮৩৯ জনের মধ্যে ৮৮ জন অস্ত্র পাচার, ১ হাজার ৮৩০ জন মাদক পাচার, ৩৩২ জন গবাদিপশু পাচার এবং ২২ জন মানব পাচারে জড়িত। এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমার থেকে প্রসাধনী, কাপড়, মসলা, সোনা, রুপা ও অন্যান্য পণ্য পাচারে জড়িত ২ হাজার ৫৬৭ জন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্ত দিয়ে পণ্য পাচারের পর দেশের অভ্যন্তরেও একই চক্রের সদস্যরা সক্রিয় থাকে। সীমান্তে কাজ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় চক্রের সদস্যদের মধ্যে অদলবদল করা হয়। অস্ত্র, মাদক ও গবাদিপশু পাচারকারী চক্রে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি সক্রিয়। তাঁদের কেউ কেউ বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব জেলায় বেশি চোরাকারবারি
আরও পড়ুন
ছুটি শেষে রাজধানীমুখী মানুষের ঢল, ১ ঘণ্টা আগে
গোয়েন্দা তথ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ৭৪৭ জন চোরাকারবারির নাম উঠে এসেছে। এ ছাড়া দিনাজপুরে ৩৩৭, যশোরে ২২৪, লালমনিরহাটে ২১২, কুমিল্লায় ২১০, ফেনীতে ২০২, পঞ্চগড়ে ১৯৬, কক্সবাজারে ১৮৬, কুড়িগ্রামে ১৮৪, সাতক্ষীরায় ১৭৩, রাজশাহীতে ১৬৪, মৌলভীবাজারে ১৫৭, চুয়াডাঙ্গায় ১৩৭, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৩২, ঝিনাইদহে ১২৬, নওগাঁয় ১১৮, সিলেটে ১১০, খাগড়াছড়িতে ১০৭, বান্দরবানে ১০১ এবং মেহেরপুরে ৮০ জন চোরাকারবারি সক্রিয় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অস্ত্র পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সীমান্ত এলাকায় ৩৮ জন সক্রিয় রয়েছেন। এর মধ্যে খাগড়াছড়িতে ২২ ও রাঙামাটিতে ১৬ জন। এ ছাড়া রাজশাহীতে ২, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭, যশোরে ৭, সাতক্ষীরায় ৭, কুষ্টিয়ায় ২, চুয়াডাঙ্গায় ১০, মেহেরপুরে ২, নেত্রকোনায় ৭ এবং কুমিল্লায় ৫ জন অস্ত্র কারবারির তথ্য রয়েছে।
মাদক পাচারের ক্ষেত্রে রাজশাহীতে ১৪৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪৯৪, যশোরে ১৪০, চুয়াডাঙ্গায় ৮৬, দিনাজপুরে ২৮১, কুড়িগ্রামে ৯০ ও কুমিল্লায় ১৬০ জনের তথ্য উঠে এসেছে। কক্সবাজারেও শতাধিক মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গবাদিপশু পাচারে সবচেয়ে বেশি তৎপরতা রয়েছে লালমনিরহাটে। জেলায় এ ধরনের ১৫১ জন কারবারির তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নওগাঁয় ৫২, পঞ্চগড়ে ৪০, নীলফামারীতে ৩৯ ও কুড়িগ্রামে ২০ জনের নাম রয়েছে।
মানব পাচারে ঝিনাইদহের সীমান্তে সবচেয়ে বেশি তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে। জেলায় এ ধরনের ৯ জন সক্রিয় রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গায় ৪, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩, ময়মনসিংহে ৩ ও শেরপুরে ৩ জনের তথ্য রয়েছে।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ১৬ হাজার কোটি টাকার টেন্ডার আসছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ১ ঘণ্টা আগে
সোনা ও রুপা পাচারের সঙ্গে নীলফামারীতে একজনের নাম পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ঝিনাইদহ, যশোর, সাতক্ষীরা ও মেহেরপুর সীমান্তেও কয়েকজন কারবারি সক্রিয় রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যান্য পণ্য পাচারের ক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ২৪১ জনের তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া সাতক্ষীরায় ১৬৬, মেহেরপুরে ৬২, পঞ্চগড়ে ১৪৫, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৫৯, দিনাজপুরে ৪৬, সুনামগঞ্জে ১০৫, মৌলভীবাজারে ১৪৪, বান্দরবানে ৯৯, খাগড়াছড়িতে ৮৪, ফেনীতে ১৮০ ও কুমিল্লায় ৪৫ জনের নাম রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সবচেয়ে বেশি নাম
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭৪৭ জন চোরাকারবারির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭ জন অস্ত্র, ৫ জন গবাদিপশু এবং ৪৯৪ জন মাদক পাচারে জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৪১ জন বিভিন্ন পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত।
আরও পড়ুন
সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশের নিয়ম পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ১ ঘণ্টা আগে
প্রতিবেদনে শিবগঞ্জে অস্ত্র কারবারে জড়িত হিসেবে শামিম, মনিরুল ইসলাম, গামা, সেলিম মিয়া, শাহিন মিয়া, মিনারুল ও জিহাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। গোমস্তাপুরে গবাদিপশু, মাদক ও অন্যান্য পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে সাদ্দাম, সাত্তার, চিরলা খাতুন, রাবেয়া বেগম, মহিবুল্লাহ, তালেফ মিয়া, শুভ মিয়া, রোকনপুরের সুলতান, ডাবলু, জিয়া ও মিলনের নাম এসেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট এলাকার আরও কয়েকজনের নামও প্রতিবেদনে রয়েছে। তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখানে নেই।
যশোর ও সাতক্ষীরার সীমান্তেও তৎপরতা
যশোরের বিভিন্ন সীমান্তে ২২৪ জন চোরাকারবারি সক্রিয় রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭ জন অস্ত্র, ১৪০ জন মাদক এবং ৭৭ জন অন্যান্য পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে চৌগাছা, বেনাপোল ও পুটখালীসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক ব্যক্তির নাম রয়েছে।
আরও পড়ুন
জাতিসংঘের অর্থবহ সংস্কারের পক্ষে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ১ ঘণ্টা আগে
সাতক্ষীরার সীমান্তে ১৭৩ জন চোরাকারবারির তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ৭ জন অস্ত্র পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কলারোয়া, শ্যামনগর, কালীগঞ্জ ও দেবহাটা এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তির নামও এতে রয়েছে।
অন্যান্য সীমান্তবর্তী জেলায় তৎপরতা
দিনাজপুরে ৩৩৭ জন চোরাকারবারির তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ২৮১ জন মাদক পাচারে এবং ১০ জন গবাদিপশু পাচারে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লালমনিরহাটে ২১২ জনের মধ্যে ১৫১ জন গবাদিপশু এবং ২০ জন মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে।
সিলেট, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকাতেও বিভিন্ন ধরনের চোরাচালানে জড়িত ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে। কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ ও চকরিয়া এলাকায় মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে কয়েকজনের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য প্রবেশ ও পাচার রোধে নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে প্রতিবেদনে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।