https://newsbdc.com/business-economy/mvm42a3ekc
ব্যাঙ্ককে বাংলাদেশকে আশ্বাস, নিশ্চিত নয় অর্থায়ন
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা এগিয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তবে প্রস্তাবিত অর্থায়ন ও ঋণ কর্মসূচির কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে সংস্থা দুটির বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, বাজেট সহায়তা ও নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের কাছে আগামী তিন বছরে নিয়মিত সহায়তার বাইরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রকল্প অর্থায়ন ও বাজেট সহায়তা মিলিয়ে ৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব এবং আইএমএফের সঙ্গে সম্ভাব্য ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে।
গত ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। প্রতিনিধিদলে অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন।
অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, বার্ষিক সভার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা (আইএফসি) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়। এসব আলোচনায় অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কর্মসংস্থান, বেসরকারি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক অর্থায়ন গুরুত্ব পায়।
আরও পড়ুন
বাজারে কমেছে সবজি ও ডিমের দাম ২৩ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ‘রেজিলিয়েন্স, রিফর্ম অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ’ (আরআরআইপি) কাঠামোর আওতায় আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবটি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে অর্থায়নের চূড়ান্ত অনুমোদন, শর্ত ও অর্থছাড়ের সময়সীমা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় সরবরাহ ও বাণিজ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে ৪ বিলিয়ন ডলার, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা রক্ষায় দেড় বিলিয়ন ডলার, আর্থিক খাত পুনরুদ্ধার ও ব্যাংকিং সংস্কারে ৩ বিলিয়ন ডলার এবং জরুরি ও যৌথ অর্থায়নের জন্য আরও দেড় বিলিয়ন ডলার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন
শুল্কছাড়ের সুফল ভোক্তা পেয়েছে কি না, জানতে চায় এনবিআর ২৩ অক্টোবর ২০২৬
সরকারের লক্ষ্য আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাঠামোটি চূড়ান্ত করা। এ জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি কারিগরি দল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
চলতি অর্থবছরে ৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার চায় সরকার
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রস্তাবের পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে ৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে সরকার। এর মধ্যে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার প্রকল্প অর্থায়ন এবং ১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা হিসেবে চাওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে তুলনামূলক কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সুবিধার জন্য ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের আইডা গ্যারান্টি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের ফিন্যানশিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২ এবং খাদ্য নিরাপত্তায় জরুরি সহায়তার জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব।
আরও পড়ুন
দেশের বাজারে আবারও কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কমেছে ২১৫৮ টাকা ২৩ অক্টোবর ২০২৬
এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডর, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা ইনার সার্কুলার রিং রোড এবং রাজধানীর চারপাশের নদী ও খাল পুনরুদ্ধার নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা
আইএমএফের সঙ্গে সম্ভাব্য ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে। ১৬ অক্টোবর ব্যাংককে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আলোচনায় নীতিগত অগ্রগতি হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে দুই পক্ষের কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
আলোচনায় কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। সম্ভাব্য কর্মসূচিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে ঋণের শর্ত ও অর্থছাড়ের সময়সূচি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
আরও পড়ুন
বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা, সুদ পরিশোধে বাড়ছে ব্যয় ২৩ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ
প্রতিনিধিদল ইউরোক্লিয়ার, সিটি, ফিচ রেটিংস, নিউইয়র্ক ফেড, এইচএসবিসি, ব্যাংক অব আমেরিকা ও জেপি মরগানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং, সার্বভৌম বন্ড, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়।
অন্যদিকে আইএফসির সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার, ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন, বাণিজ্য অর্থায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয় উঠে আসে। সরকারি প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে। তবে নতুন অর্থায়নের নির্দিষ্ট পরিমাণ বা অর্থছাড়ের সময়সীমা জানানো হয়নি।
আরও পড়ুন
জ্বালানি তেলের আমদানিতে এলসি খোলা বেড়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ ২২ অক্টোবর ২০২৬
অর্থায়নের পাশাপাশি সংস্কারেও গুরুত্ব
দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও বিনিয়োগে মন্থরতার কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন বাড়ছে। নতুন অর্থায়ন বাজেট ঘাটতি মোকাবিলা, জ্বালানি ও খাদ্য আমদানি এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগে সহায়তা করতে পারে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে ঋণের শর্ত, অর্থের ব্যবহার, সংস্কার বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির ওপর।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের অর্থায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এসব সংস্থার তুলনামূলক কম খরচের ঋণ বাজেট ঘাটতি মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনীতির প্রতি আস্থা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচার বন্ধে কার্যকর সংস্কার না হলে অর্থনীতির ঝুঁকি থেকে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।