https://newsbdc.com/politics/mvarpgl5tk
কর্মসংস্থান ও শিল্পের চাহিদা মেলাতে পূর্ণাঙ্গ টিভেট ইকোসিস্টেম গড়ছে বাংলাদেশ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সবুজ শিল্পের প্রসারে বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা এবং শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে (টিভেট) আধুনিকায়নের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, শিক্ষার্থীরা যেন শুধু সনদ অর্জনেই সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারিক, প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল দক্ষতা নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে।
শুক্রবার চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে জাতীয় বক্তব্যে এসব কথা বলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
আরও পড়ুন
প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি তা বাস্তবায়ন করে: রিজভী ২৩ অক্টোবর ২০২৬
তিয়ানজিন মেইজিয়াং কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে আয়োজিত সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘টিভেট: পরিবর্তনকে যৌথভাবে গ্রহণ, যৌথভাবে মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং যৌথভাবে ভবিষ্যৎ নির্মাণ’। এতে ৪০টিরও বেশি দেশের শিক্ষামন্ত্রী, ১০০টিরও বেশি দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল, ইউনেস্কোর প্রতিনিধি, শিল্পখাতের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়প্রধান এবং কারিগরি শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
জাতীয় বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ তার জনগণ। মানবসম্পদ উন্নয়নই জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এমন একটি সেতুবন্ধন, যা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে, একাডেমিক জ্ঞানকে বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে এবং তরুণদের সম্ভাবনাকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতের অর্থনীতির চাহিদা পূরণে কেবল প্রথাগত একাডেমিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক, প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, ডিজিটালাইজেশন ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থার বিস্তারের ফলে কর্মক্ষেত্রে যেসব নতুন দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি।
আরও পড়ুন
শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে সংলাপে বসছে বিএনপি ২৩ অক্টোবর ২০২৬
শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের টিভেট সংস্কার শুধু নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে পাঠ্যক্রম শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, শিক্ষকরা পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের দক্ষতা হালনাগাদ করবেন, শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পাবে এবং জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর সঙ্গে কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগের সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে।
শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা তৈরি না হলে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশের জন্য উপযুক্ত কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার নিয়োগদাতারাও প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন। এই ব্যবধান কমাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশি এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রমে শিল্পের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে প্রশিক্ষণ শেষে কর্মজীবনে প্রবেশের পথও সহজ হতে পারে।
আরও পড়ুন
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আব্দুল মঈন খান ২২ অক্টোবর ২০২৬
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য হলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করা। অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষাকে শুধু নির্দিষ্ট কিছু পেশার জন্য প্রশিক্ষণ হিসেবে না দেখে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
বাংলাদেশ ও চীনের শিক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দুই দেশ শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীনের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প-সংযুক্ত ব্যবহারিক শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন
জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের প্রমাণ আছে: রিজভী ২২ অক্টোবর ২০২৬
সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তিনটি আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী। প্রথমত, উদীয়মান প্রযুক্তি ও পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের সঙ্গে তাল মেলাতে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও অভিযোজনক্ষম করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিতে হবে। তৃতীয়ত, সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত, নিয়োগদাতা, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও তরুণদের মধ্যে অংশীদারত্ব জোরদার করতে হবে।
সম্মেলনের ফাঁকে চীনের শিক্ষা উপমন্ত্রী রেন ইউছুয়েনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নেন শিক্ষামন্ত্রী। সেখানে বাংলাদেশের বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, যৌথ কারিগরি শিক্ষা কর্মসূচি চালু, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনা সরকারি বৃত্তি সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশ-চীন যৌথ কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ এসব অগ্রাধিকারমূলক সহযোগিতা বাস্তবায়নে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানানো হয়।
চীন-বাংলাদেশ যৌথ কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে উচ্চতর প্রযুক্তি শিক্ষা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং শিল্পভিত্তিক গবেষণায় সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে পাঠ্যক্রমের মান, প্রশিক্ষকদের দক্ষতা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ নিশ্চিত করার ওপর।
আরও পড়ুন
পদত্যাগের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আমাকে সেরা পরামর্শ দিয়েছেন: ইশরাক ২২ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো কারিগরি শিক্ষার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি এর গুণগত মান নিশ্চিত করা। প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সাজানো, নিয়মিত দক্ষতা যাচাই, শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারী, পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী ও সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের জন্য কারিগরি শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এখন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার। শিল্পের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ভিত্তি শক্ত করতে সহায়ক হতে পারে।
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।