https://newsbdc.com/national-district/mvqbaqbegf
৪৪ বছর পর ফিরছে গ্রাম সরকার, খসড়ায় ১৭ সদস্যের কাঠামো
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। এ লক্ষ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে ১৭ সদস্যের একটি করে গ্রাম সরকার গঠন করা হবে। মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এই ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো, সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সহায়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় গ্রাম সরকারকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্র হিসেবেও এ ব্যবস্থাকে দেখছেন দলটির নেতারা।
বিশেষ করে গত ১৭ বছর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত, হামলা-মামলার শিকার এবং দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখা নেতাকর্মীদের গ্রাম সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় থাকতে পারে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য মুরব্বি, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা গ্রামীণ উন্নয়ন ও স্থানীয় সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রেখেছিল। খাল খনন কর্মসূচির মতো এ ব্যবস্থাও গ্রাম পর্যায়ে পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে চালু করা হয়েছিল বলে মনে করেন তারা। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনি ইশতেহারেও গ্রাম সরকার ব্যবস্থা পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
নভেম্বরের মধ্যে চালুর লক্ষ্য বন্ধ তিন সার কারখানা ২ ঘণ্টা আগে
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, গ্রাম সরকার ব্যবস্থা আবার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিএনপি অঙ্গীকারবদ্ধ। জনগণের কল্যাণে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচির মতো গ্রাম সরকার চালু করাও সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে।
তিনি বলেন, গ্রাম সরকারে স্থানীয় পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পাশাপাশি দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদেরও মূল্যায়ন করা হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, জিয়াউর রহমানের আমলে গ্রাম সরকারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন—এমন ব্যক্তিদের মধ্যে অল্পসংখ্যক এখনো জীবিত আছেন। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন গ্রাম সরকারের সদস্যদের পরিচিতি ও প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য বিভিন্ন কাজ চলছে।
আরও পড়ুন
‘বিগ-বি’ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে একমত বাংলাদেশ-জাপান: তাকাইচি ২ ঘণ্টা আগে
তিনি আরও বলেন, গ্রাম পর্যায়ে দলের নতুন নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও এ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। যারা দেশের জন্য কাজ করতে চান, সৎভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ইতিবাচক চিন্তাভাবনা ধারণ করেন, তাদের নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের ৪ হাজার ৫৬৮টি ইউনিয়নের ৯টি করে ওয়ার্ড মিলিয়ে মোট ৪১ হাজার ১১২টি ওয়ার্ডে গ্রাম সরকার গঠন করা হবে। সে হিসাবে প্রতিটি গ্রাম সরকারে ১৭ জন করে সদস্য থাকলে সারা দেশে কয়েক লাখ মানুষের স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে খসড়ায় সদস্যদের সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচনের বিধান রাখা হয়নি। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনগণের মতামত-পরামর্শের ভিত্তিতে সদস্য নির্বাচন করার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়ায় সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কমপক্ষে ১০ শতাংশ ভোটারের হ্যাঁ-না ভোটের বিধান রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় সমর্থন বা মনোনয়ন না পাওয়া যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও কাউকে কাউকে গ্রাম সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিএনপির কয়েকজন নেতা। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা এবং রাজনৈতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের মূল্যায়নেও এ ব্যবস্থা ভূমিকা রাখতে পারে বলে তাদের ধারণা।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, প্রতিটি গ্রাম সরকারে থাকবেন একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা এবং ১৫ জন সাধারণ সদস্য। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য গ্রাম সরকারের প্রধান এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
আরও পড়ুন
বৈঠক শেষে তারেক রহমানের সৌজন্যে অফিসিয়াল ভোজে দুই প্রধানমন্ত্রী ২ ঘণ্টা আগে
১৫ জন সাধারণ সদস্যের মধ্যে থাকবেন দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দুজন সদস্য—একজন পুরুষ ও একজন নারী—এবং দুজন কৃষক। এ ছাড়া নিকাহ রেজিস্ট্রার, সমবায় সমিতির সদস্য, পল্লী চিকিৎসক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শ্রমিক, যুব প্রতিনিধি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। কোনো শ্রেণির প্রতিনিধি পাওয়া না গেলে গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবকের সংখ্যা বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে।
গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। প্রথমবার সরকার গঠনের তারিখ সরকারি গেজেটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে সরকার। পরবর্তী সময়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নতুন গ্রাম সরকার গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। কোনো গ্রাম সরকার বাতিল হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন সরকার গঠন করতে হবে। গঠনের ৩০ দিনের মধ্যে সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। মোট সদস্যের এক-তৃতীয়াংশ উপস্থিত থাকলে সভার কোরাম পূর্ণ হবে।
খসড়া অনুযায়ী, গ্রাম সরকারের কোনো সদস্য প্রধানের কাছে লিখিত আবেদন দিয়ে পদত্যাগ করতে পারবেন। আবেদন জমা দেওয়ার দিন থেকেই পদত্যাগ কার্যকর হবে। পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকলে সদস্যপদ শূন্য হবে। অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলেও সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন।
আরও পড়ুন
জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ২ ঘণ্টা আগে
গ্রাম সরকারের কার্যালয় স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী স্থানের হাটবাজার বা উপযুক্ত এলাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। গ্রামের রাস্তাঘাট ও কালভার্ট উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয় পর্যালোচনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে ভূমিকা রাখবে এ প্রতিষ্ঠান।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির দায়িত্বও গ্রাম সরকারের ওপর দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহযোগিতা, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার কর্মসূচিতে সহায়তা করবে এর সদস্যরা। কৃষি উপকরণের সংকট সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে।
সময়ের চাহিদা বিবেচনায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড বিতরণে সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বও প্রস্তাবিত আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ভিজিএফ ও ভিজিডি কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার উৎসাহিত করার কাজে সহযোগিতা করবে গ্রাম সরকার।
আরও পড়ুন
শীর্ষ বৈঠক শেষে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী ৩ ঘণ্টা আগে
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৮০ সালে গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রথম গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। সে সময় খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, পরিবার পরিকল্পনা, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ছোটখাটো বিরোধ মীমাংসাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর এ ব্যবস্থা বেশিদিন টেকেনি। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে গ্রাম সরকার বিলুপ্ত করা হয়।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ফেরার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এ ব্যবস্থা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে গ্রাম সরকার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০০৩’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। ওই আইনে প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা এবং ১৩ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের বিধান ছিল।
আইনটি প্রণয়নের পর আদালতে রিট হলে ২০০৫ সালের ২ আগস্ট হাইকোর্ট গ্রাম সরকার আইনকে অসাংবিধানিক ও অকার্যকর ঘোষণা করেন। পরে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রাম সরকার রহিতকরণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে গ্রাম সরকার রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে ব্যবস্থাটি আইনগতভাবে বাতিল করা হয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে গ্রাম সরকার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। গত ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে প্রস্তাব ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে। খসড়াটি মতামতের জন্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।