https://newsbdc.com/lifestyle-wellness/mvnivybvl9
শিশুর কল্পনার জগৎ: অভিভাবকদের যা জানা জরুরি
অনেক শিশুকে একা একা কথা বলতে, পুতুলের সঙ্গে গল্প করতে কিংবা পাশে কেউ না থাকলেও কাল্পনিক বন্ধুর সঙ্গে খেলার মতো আচরণ করতে দেখা যায়। কখনো তারা খাবার টেবিলে সেই বন্ধুর জন্য চেয়ার রাখে, আবার কখনো খেলনা দিয়ে সাজানো সংসারে তাকে পরিবারের একজন সদস্যের মতো জায়গা দেয়।
এমন দৃশ্য দেখে অভিভাবকদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—শিশুর এই আচরণ কি স্বাভাবিক?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট শিশুদের কাল্পনিক বন্ধু তৈরি করার প্রবণতা সাধারণত বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক অংশ। এটি শিশুর কল্পনাশক্তি, চিন্তাভাবনা ও অনুভূতি প্রকাশের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই এমন আচরণ দেখলেই শিশুর কোনো সমস্যা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
আরও পড়ুন
ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি সতেজ পরিবেশ দেবে যে ১০ গাছ ২০ ঘণ্টা আগে
দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের শিশু, কৈশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, কাল্পনিক বন্ধু তৈরি করা শিশুর বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত।
কেন তৈরি হয় কাল্পনিক বন্ধু?
কল্পনা করার অর্থ হলো, সামনে উপস্থিত নেই এমন কোনো বিষয়কে মনে মনে ভাবতে পারা। শিশুর চিন্তা ও বোঝার ক্ষমতা বিকাশে এই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত তিন বছর বয়সের দিকে শিশুদের মধ্যে এমন প্রবণতা দেখা দিতে শুরু করে। তিন থেকে সাত বছর বয়সের মধ্যে কাল্পনিক বন্ধু তৈরি করার প্রবণতা বেশি দেখা যেতে পারে।
শিশুরা খেলতে খেলতেই নিজেদের কল্পনার জগৎ তৈরি করে। একটি বালিশ হয়ে ওঠে গাড়ি, চামচ হয়ে যায় মাইক্রোফোন, আবার পুতুল হয়ে ওঠে তাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। কখনো তারা কাল্পনিক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে, তাকে খাবার খাওয়ানোর ভান করে কিংবা একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার গল্প তৈরি করে।
আরও পড়ুন
খেজুরের গুড়ের ঐতিহ্যে দেশজুড়ে পরিচিত যে জেলা ১ নভেম্বর ২০২৬
সুইস মনোবিজ্ঞানী জ্যঁ পিয়াজের তত্ত্বেও ছোট শিশুদের শেখার ক্ষেত্রে কল্পনা ও অভিনয়ধর্মী খেলার গুরুত্ব উঠে এসেছে। এ ধরনের খেলায় শিশুরা পরিচিত অভিজ্ঞতা ও চারপাশের ঘটনাগুলো নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেয়।
বাংলাদেশের শিশুদের খেলাধুলায়ও দেখা যায় এমন প্রবণতা
বাংলাদেশের পারিবারিক পরিবেশেও শিশুদের কল্পনানির্ভর খেলার নানা উদাহরণ দেখা যায়। ঘরে পুতুলের বিয়ে দেওয়া, খেলনা দিয়ে দোকান সাজানো, রান্নাবাটি খেলা কিংবা নিজের তৈরি কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে কথা বলা—এসবের মধ্য দিয়ে শিশুরা নিজেদের মতো করে গল্প তৈরি করে।
কখনো শিশুরা মা-বাবা, শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা দোকানদারের ভূমিকায় অভিনয় করে। পরিচিত মানুষের আচরণ অনুকরণ করতে গিয়ে তারা নিজেদের কল্পনার জগৎকে আরও বিস্তৃত করে। এ ধরনের খেলায় পালা করে কথা বলা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বিভিন্ন পরিস্থিতি কল্পনা করার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে সব শিশু একইভাবে কল্পনা প্রকাশ করে না। কেউ কাল্পনিক বন্ধু তৈরি করে, কেউ পুতুল বা খেলনার সঙ্গে কথা বলে, আবার কেউ ছবি আঁকা, গল্প বলা কিংবা একা একা অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের ভাবনা প্রকাশ করে।
আরও পড়ুন
এইচএসসির ফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীকে যেভাবে সান্ত্বনা দেবেন ৩১ অক্টোবর ২০২৬
শিশুর বিকাশে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
কাল্পনিক বন্ধুকে ঘিরে গল্প তৈরি করার সময় শিশু নিজের মতো করে বিভিন্ন পরিস্থিতি কল্পনা করে। কখনো সে বন্ধুকে বিপদ থেকে বাঁচায়, কখনো তার সঙ্গে ঝগড়া করে, আবার কিছুক্ষণ পর মিলমিশ করে নেয়। এ ধরনের খেলায় অনুভূতি প্রকাশ, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা এবং সামাজিক পরিস্থিতি বোঝার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শিশুরা অনেক সময় নিজেদের ভয়, আনন্দ কিংবা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা খেলায় ফুটিয়ে তোলে। যেমন, স্কুলে নতুন বন্ধু তৈরি করতে না পারলে কোনো শিশু তার কাল্পনিক বন্ধুর সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার গল্প করতে পারে। তবে শুধু এমন আচরণ দেখেই শিশুর মনের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অভিভাবকদের কী করা উচিত?
শিশু কাল্পনিক বন্ধুর কথা বললে তাকে বকাঝকা করা, ভয় দেখানো কিংবা উপহাস করা উচিত নয়। বরং সে কী নিয়ে কথা বলছে, কী ধরনের গল্প তৈরি করছে, তা মনোযোগ দিয়ে শোনা যেতে পারে। এতে শিশু নিজের ভাবনা ও অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পায়।
আরও পড়ুন
গরু নাকি মহিষের ঘি, কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর? ৩০ অক্টোবর ২০২৬
অভিভাবকেরা শিশুর সঙ্গে গল্পের বই পড়তে পারেন, ছবি আঁকতে উৎসাহ দিতে পারেন কিংবা পুতুল ও খেলনা দিয়ে অভিনয়ধর্মী খেলায় অংশ নিতে পারেন। এসব কার্যক্রমে শিশুর সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি তার কল্পনাশক্তি বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়।
পড়াশোনা, পরীক্ষার প্রস্তুতি ও মোবাইল ফোন ব্যবহারের মধ্যে শিশুর অবসর সময় সীমিত হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিদিন কিছুটা সময় শিশুকে নিজের মতো খেলতে দেওয়া, তার কথা শোনা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কাল্পনিক বন্ধুকে ঘিরে শিশুর প্রতিটি গল্পের ব্যাখ্যা খোঁজারও প্রয়োজন নেই। শিশুর বয়স, স্বভাব ও আগ্রহ অনুযায়ী তাকে নিজের মতো করে খেলতে দেওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন
ব্যস্ত জীবনে বিরতি নেওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কেন প্রয়োজন ২৯ অক্টোবর ২০২৬
কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?
কাল্পনিক বন্ধু থাকা একাই কোনো মানসিক সমস্যার প্রমাণ নয়। তবে শিশুটি যদি অতিরিক্ত ভীত হয়ে পড়ে, দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে, অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় কিংবা আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এমন পরিস্থিতিতে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। শিশুর আচরণের পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা বুঝতে তার সামগ্রিক বিকাশ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
কাল্পনিক বন্ধু তৈরি করা অনেক শিশুর বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। তাই এমন আচরণ দেখেই আতঙ্কিত না হয়ে শিশুকে বোঝার চেষ্টা করা, তার সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করাই অভিভাবকদের প্রধান দায়িত্ব।
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।