https://newsbdc.com/politics/mvahyazttp
স্থানীয় ভোটে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নিচ্ছে না চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তবে নির্বাচনে দলটির সমর্থক ও ভোটারদের অবস্থান এবং তাদের সংরক্ষিত ভোটব্যাংক প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি ও স্থানীয় সমীকরণের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর বিবেচনায় আসছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের হিসাব-নিকাশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, দলটির এই ভোট নির্বাচনের ফলের হিসাব বদলে দিতে পারে। ফলে এই ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা তৎপরতা চালাচ্ছেন।
তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে রাজনৈতিক প্রচারে না থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণে দলটির ভোটব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীয় রাজনীতির পটপরিবর্তন হলেও মাঠপর্যায়ে বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা দলটির ভোটার ও সমর্থকেরা পুরোপুরি হারিয়ে যাননি। নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশে এই ভোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে নিজ দলের ভোটের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট কৌশলগতভাবে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছেন অনেক প্রার্থী। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক যোগাযোগ, নানা প্রতিশ্রুতি ও প্রচার চালানো হচ্ছে। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও এমন চিত্র দেখা গেছে।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবার দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। ফলে জাতীয় নির্বাচনের ভোটের সমীকরণের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে মেলানো সমীচীন হবে না। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ দলীয়করণ করলেও বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়ে অনেক জায়গায় জয়লাভ করেছে। দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম এর উদাহরণ। তিনি যতবার নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, ততবারই জয়লাভ করেছেন। তাই এলাকায় জনপ্রিয়তা, প্রার্থীর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও জনসম্পৃক্ততা থাকলে তেমন দুশ্চিন্তার কারণ হবে না।
আরও পড়ুন
স্থানীয় নির্বাচনে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির উদ্যোগ ৪ ঘণ্টা আগে
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড মানুষ দীর্ঘদিন দেখেছে এবং অনেকে দলটির প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। ফলে ভোটের হিসাবে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের অবস্থান তেমন প্রভাব ফেলবে না বলে তিনি মনে করেন।
বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের ব্যবধান বিভিন্ন নির্বাচনে খুব বেশি না থাকলেও কিছু নির্বাচনে তা উল্লেখযোগ্য ছিল। বিতর্কমুক্ত হিসেবে বিবেচিত চার নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ ভোট পায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং বিএনপি ৩৩ দশমিক ৬১ শতাংশ ভোট পায়। ২০০১ সালে বিএনপি ৪০ দশমিক ৮৬ শতাংশ ও আওয়ামী লীগ ৪০ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট পায়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ পায় ৪৯ শতাংশ এবং বিএনপি ৩৩ দশমিক ২০ শতাংশ ভোট।
আরও পড়ুন
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ নিয়ে যা বললেন রিজভী ১১ ঘণ্টা আগে
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপি ও বিরোধী দলগুলো আগের রাতে ভোট গ্রহণের অভিযোগ তোলে। এ অভিযোগের কারণে নির্বাচনটি রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।
এই তিন নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ৭২ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং বিএনপি ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোট পায়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ৬৫ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় রাজনীতির এই সমীকরণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের অবস্থান, স্থানীয় পর্যায়ে দলটির সাবেক ও বর্তমান নেতাদের প্রভাব এবং বিভিন্ন প্রার্থীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নির্বাচনী হিসাব-নিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের প্রভাব ইউনিয়ন, পৌরসভা কিংবা উপজেলাভেদে ভিন্ন হতে পারে। দলটির ভোট সব এলাকায় একইভাবে কাজ করবে, এমন নয়। কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের একটি অংশ নির্দিষ্ট প্রার্থীর দিকে ঝুঁকলে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় আওয়ামী লীগের সমর্থন বেশি, সেখানে এ ভোটের প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, কোনো কোনো এলাকায় দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ এবং স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জয়ের নির্ধারক হতে পারে।
আরও পড়ুন
প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি তা বাস্তবায়ন করে: রিজভী ২৩ অক্টোবর ২০২৬
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। দলটির অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে বিএনপি ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সর্বোচ্চ ভোটের হার ছিল ১৯৯১ সালে ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ। নির্বাচনে জামায়াতের ভোট বৃদ্ধির পেছনে আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন ভূমিকা রেখেছে—এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে রয়েছে। অনেকের মতে, জাতীয় নির্বাচনে বেশ কিছু আসনে আওয়ামী লীগের ভোটারদের অবস্থান ফলাফলে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। সেই বিবেচনায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোটের অবস্থান নির্বাচনী হিসাব বদলে দিতে পারে।
তবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ মনে করেন, বিগত সময়ের পরিস্থিতি আর বর্তমান সময় এক নয়। তাঁর মতে, আগের সময়ে আওয়ামী লীগের ভোট একতরফা ছিল এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে জামায়াত প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব পায়নি। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সেই ভোটব্যাংক আর নেই বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, দলটির কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ফলে নির্বাচনে আগের মতো প্রভাব পড়বে না। কালবেলাকে তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভোট নয়; এখানে প্রার্থীর যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও জনসম্পৃক্ততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নীতিনির্ধারণী ফোরামের রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও দলটির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার কালবেলাকে বলেন, দলীয় প্রতীক তুলে দেওয়ায় জাতীয় নির্বাচনের মতো দলগত অবস্থানের হিসাব স্থানীয় নির্বাচনে তেমন প্রভাব ফেলবে না। স্থানীয় নির্বাচনের বাস্তবতা আলাদা। ভোটাররা স্থানীয় প্রার্থীর জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেবেন এবং ভোট বিভিন্ন দিকে পড়বে।
আরও পড়ুন
শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে সংলাপে বসছে বিএনপি ২৩ অক্টোবর ২০২৬
নির্বাচন কমিশন সারা দেশে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে। পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনের প্রথম ধাপ শুরু হবে আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি এবং শেষ ধাপ ২৭ মে। স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় ও প্রতীকহীন হওয়ায় নির্দিষ্ট কোনো দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচন থেকে বিরত রাখার আইনি সুযোগ কমিশনের নেই। ফলে চাইলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থকেরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় সম্পর্কের প্রভাব অনেক সময় বেশি দৃশ্যমান হয়। চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটারদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, এলাকার সমস্যা সমাধানে অতীতে তাঁদের ভূমিকা এবং স্থানীয় বিরোধের মতো বিষয় ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুন
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আব্দুল মঈন খান ২২ অক্টোবর ২০২৬
তাঁরা আরও বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় ভোটেও ধর্মের ব্যবহার প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণাও ভোটের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এলাকাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া খবর ও গুজব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এতে সহিংসতা বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন এক নয়। জাতীয় নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা বিএনপি ও জামায়াত করেছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই চেষ্টা থাকা স্বাভাবিক। বিষয়টি কিছু এলাকায় জয়-পরাজয়ে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে সব জায়গায় নয়।
তাঁর মতে, স্থানীয় নির্বাচনে এলাকার প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা বড় ভূমিকা রাখে। তৃণমূল পর্যায়ে ভোটাররা একে অপরকে চেনেন এবং প্রার্থীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানেন। তাই জাতীয় নির্বাচনের মতো আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক স্থানীয় নির্বাচনে সর্বত্র সমান প্রভাব ফেলবে না।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।