https://newsbdc.com/sara-desh/mv93zxnpke
আগের পাঁচ প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন, চট্টগ্রামে ফের উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা
চট্টগ্রাম নগরীর যানজট নিরসনে গত ১৫ বছরে পাঁচটি বড় উড়াল সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। তবে এসব অবকাঠামোর সামগ্রিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নগরের অক্সিজেন মোড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু উড়াল সড়ক নির্মাণ করে যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থা, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো।
নগরের বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত উড়াল সড়কগুলোর কোথাও সংযোগ সড়ক ও র্যাম্পের ঘাটতি, কোথাও নিচের সড়কে যানজট, আবার কোথাও ব্যয় বৃদ্ধি ও নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, এসব অবকাঠামোর কারণে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও মাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) চালুর সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।
অক্সিজেন মোড়ে নতুন উড়াল সড়কের পরিকল্পনা
নগরের উত্তর প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত অক্সিজেন মোড়ে নতুন উড়াল সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সিডিএ। গত বছরের জুলাইয়ে প্রকল্পটির নকশা ও বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ শুরু হয়। শিগগিরই অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন
গাজীপুরে গুদামে আগুন, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট ৪ ঘণ্টা আগে
প্রস্তাবিত উড়াল সড়কটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর একটি র্যাম্প বায়েজিদ থেকে হাটহাজারী সড়কের সঙ্গে এবং অন্যটি কুয়াইশ সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। হাটহাজারী সড়ক থেকে বায়েজিদ ও মুরাদপুরের দিকে দুটি র্যাম্প রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। কুয়াইশ সড়ককে সরাসরি বায়েজিদের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ছয় লেনের কুয়াইশ সড়কও উড়াল সড়কের সঙ্গে সমন্বিত করা হবে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার।
সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন গত সোমবার সমকালকে বলেন, অক্সিজেনের উড়াল সড়ক প্রকল্পটি শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে এটি দ্রুত অনুমোদন পাবে বলে তিনি আশা করছেন। অনুমোদন পেলে অল্প সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগের উড়াল সড়কগুলোর অভিজ্ঞতার পর নতুন প্রকল্পটি কতটা সুফল দেবে, জানতে চাইলে বেলায়েত হোসেন বলেন, শহরে ইট-কংক্রিটের অবকাঠামোগত চাপ কমানো ভালো। তবে অক্সিজেন মোড়ের উড়াল সড়কটি সময়ের দাবি। এতে সাতটি সড়কে সাতটি র্যাম্প নামবে, যা যান চলাচল সহজ করবে বলে তিনি মনে করেন।
বাস টার্মিনাল চালু হলে কমতে পারে যানজট
আরও পড়ুন
খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়ক অবরোধ, দুর্ভোগে যাত্রীরা ৭ ঘণ্টা আগে
অক্সিজেন মোড়ের যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে সড়কের পাশে উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামগামী বাস এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ডকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এসব স্ট্যান্ডে যাত্রী ওঠানামা এবং সড়কের পাশে যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকার কারণে মোড়ে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
চট্টগ্রাম নগরের কুলগাঁও বালুচরা সিটি করপোরেশন বাস টার্মিনালটি চলতি মাসে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এটি চালু হলে উত্তর চট্টগ্রামগামী বাসগুলো সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। এতে অক্সিজেন মোড়ের যানজট কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সুবীর মহাজন বলেন, অক্সিজেন মোড়ে উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার অন্তত ছয়টি বাসের স্ট্যান্ড রয়েছে। পাশাপাশি আছে একাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড। সড়কের পাশে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণেই সেখানে যানজট বাড়ে।
তাঁর মতে, উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিবর্তে মোড় থেকে অবৈধ যানবাহনের স্ট্যান্ড সরানো গেলে যানজট অনেকটাই কমানো সম্ভব।
চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ও পরিবহন নেতা মোহাম্মদ শাহজাহানও বাস ও অটোরিকশার স্ট্যান্ডকে যানজটের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, উত্তর চট্টগ্রামের যানবাহনের জন্য কুলগাঁও বালুচরা বাস টার্মিনালটি চলতি মাসে উদ্বোধন ও পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর কথা রয়েছে। এটি চালু হলে বাসগুলো টার্মিনালে স্থানান্তর করা যাবে এবং অক্সিজেন মোড়ের যানজট কমবে বলে তিনি আশা করছেন।
আরও পড়ুন
পূর্বাচলে ট্রাক-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে তিন বন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যু ২৩ অক্টোবর ২০২৬
বাস টার্মিনাল চালু হলে যানজট কমতে পারে—এমন যুক্তির বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, বিষয়টি ঠিক। তবে উড়াল সড়ক প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সব দিক বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
আগের উড়াল সড়ক নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিডিএ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে চারটি উড়াল সড়ক এবং লালখানবাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করে। উড়াল সড়কগুলো হলো বহদ্দারহাট, মুরাদপুর-লালখানবাজার, কদমতলী-ধনিয়ালাপাড়া ও দেওয়ানহাট। এসব অবকাঠামোর কোনোটিতে নির্দিষ্ট পথে যান চলাচল সহজ হলেও সামগ্রিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
চার হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে প্রথমে ১৫টি র্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। পরে ছয়টি র্যাম্প বাদ দেওয়া হয়। বাকি র্যাম্পগুলোর কাজ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।
আরও পড়ুন
গাজীপুরে কাভার্ড ভ্যানের চাপায় এসআইসহ নিহত ২, আহত ২ ২৩ অক্টোবর ২০২৬
২০১৪ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ‘স্টেট অব দ্য সিটিজ: গভর্ন্যান্স ফর আ লিভেবল চিটাগং’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ব্যস্ত সময়ে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ওপর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৫ গুণ ছিল।
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা ২০১৫ সালে মুরাদপুর-লালখানবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এ ধরনের অবকাঠামো গণপরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা চালুর সুযোগ সীমিত করতে পারে এবং নিচের সড়কের জায়গা সংকুচিত করতে পারে। ২০১৮ সালে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সময়ও সংগঠনটি যানজট কমাতে ফ্লাইওভারের পরিবর্তে গণপরিবহন ও পথচারীবান্ধব ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানায়।
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের দাবি, বর্তমানে এসব উড়াল সড়ক দিয়ে নগরের মাত্র ২ শতাংশ যানবাহন চলাচল করে।
সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর জোর
আরও পড়ুন
চকরিয়ায় শ্যামলী বাসের সঙ্গে পিকআপের সংঘর্ষ, নিহত ২ ২৩ অক্টোবর ২০২৬
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া মনে করেন, অক্সিজেন মোড়ের প্রস্তাবিত উড়াল সড়কও আগের প্রকল্পগুলোর মতো অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। তাঁর মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, কোন দিক থেকে কত যানবাহন আসে এবং কোন দিকে যায়, সে বিষয়ে হালনাগাদ ট্রাফিক সমীক্ষা প্রয়োজন। র্যাম্পের অবস্থান এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে বায়েজিদ, হাটহাজারী, মুরাদপুর ও কুয়াইশমুখী যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে।
পাশাপাশি নিচের সড়কে বাস ও অটোরিকশার যাত্রী ওঠানামা, পার্কিং এবং পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ফুটপাত, সাইকেল চলাচল ও গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। উড়াল সড়ক থেকে নেমে যানবাহন সামনে এগোতে না পারলে নিচের সড়কও অকার্যকর হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুভাষ বড়ুয়া আরও বলেন, মুরাদপুর-লালখানবাজার ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারণে নগরে বিআরটি ও এমআরটি চালুর সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। শহরের সবচেয়ে বড় সম্পদ ভূমি; তা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবহার করা না গেলে নগরের কার্যকারিতা ব্যাহত হয়।
সব মিলিয়ে অক্সিজেন মোড়ের যানজট নিরসনে নতুন উড়াল সড়ক নির্মাণের আগে বিদ্যমান যানবাহনের চাপ, বাস টার্মিনালের সম্ভাব্য প্রভাব, গণপরিবহন এবং পথচারীদের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
সারা দেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।