https://newsbdc.com/sara-desh/mvuumyydgy
ইনানীতে গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনা, কনডেনসেটের উপস্থিতি পেয়েছে বাপেক্স
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের গর্ত থেকে নির্গত গ্যাসের আগুন গত চার দিনেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর নমুনা ও আলামত পরীক্ষা করে উচ্চমাত্রার হাইড্রোকার্বন এবং কনডেনসেটের উপস্থিতির আভাস পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা দেখছেন। সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিষয়টি নিশ্চিত হলে উখিয়ার ইনানী হতে পারে দেশের ৩১তম গ্যাসক্ষেত্র।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এসএম নাফিকুন আরহামের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইনানীর গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত। কারণ, দেশের ভোলার শাহবাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অগভীর স্তরে পাওয়া বায়োজেনিক গ্যাসের সঙ্গে সাধারণত পানি উঠে আসে। কিন্তু ইনানীতে নির্গত গ্যাসের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। এর সঙ্গে কনডেনসেট পাওয়া যাচ্ছে, যা ভূগর্ভে উচ্চমাত্রার হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। কনডেনসেট হলো প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে পাওয়া মূল্যবান হালকা তরল পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ।
তবে এটিকে এখনই গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হিসেবে ঘোষণা করা যাচ্ছে না। গ্যাসের প্রকৃতি, উৎস, চাপ, পরিমাণ ও ভূগর্ভস্থ অবস্থান নির্ধারণে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন
রূপগঞ্জে পোশাক কারখানায় ডায়ার কম্প্রেসার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪ ৯ ঘণ্টা আগে
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এসএম নাফিকুন আরহাম বলেন, ইনানীতে উচ্চমাত্রার হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ভোলার শাহবাজপুরের গ্যাসের সঙ্গে এখানকার গ্যাসের পার্থক্য রয়েছে। শাহবাজপুরের গ্যাস মূলত বায়োজেনিক প্রকৃতির। কিন্তু ইনানীর গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট নির্গত হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এখানে গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ করতে হবে।
তিনি জানান, প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে নলকূপ খননের সময় গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর উচ্চচাপের গ্যাস বিভিন্ন ফাটল ও দুর্বল স্তর দিয়ে ভূ-পৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। পরে কোনো উৎস থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে এসে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
সুনামগঞ্জে ভয়াবহ আগুনে ১৩ বসতঘর পুড়ে ছাই ৯ ঘণ্টা আগে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের প্রভাবে জৈব পদার্থ থেকে যে গ্যাস তৈরি হয়, তাকে থার্মোজেনিক গ্যাস বলা হয়। সাধারণত গভীর গ্যাসক্ষেত্রে এ ধরনের গ্যাসের উপস্থিতি দেখা যায়। অন্যদিকে অগভীর ভূস্তরে অণুজীবের মাধ্যমে জৈব পদার্থ ভেঙে তৈরি হয় বায়োজেনিক গ্যাস। ইনানীর গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের উপস্থিতি থাকায় এটি সাধারণ অগভীর গ্যাসের চেয়ে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গত ২৭ অক্টোবর সকাল থেকে ইনানীর ছোট ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় নলকূপ খননের স্থান থেকে আগুন জ্বলছে। কয়েক দিন ধরে আগুনের তীব্রতা ও গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আগুনের পাশাপাশি বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
ঘটনার পর বাপেক্সের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা থেকে এসে মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তারা বিভিন্ন আলামত ও নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠিয়েছে। তবে গ্যাসের প্রবাহ ও তীব্রতা বেশি থাকায় সরাসরি গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন
গাজীপুরে তুরাগ নদে ডুবে পোশাকশ্রমিকের মৃ/ত্যু, ৩ ঘণ্টা পর মর/দেহ উদ্ধার ৯ ঘণ্টা আগে
সরেজমিনে দেখা যায়, উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী এলজিইডি সড়কের ছোট ব্রিজসংলগ্ন মো. আবদুল্লাহর বাড়িতে নলকূপ খননের স্থান থেকে অনবরত আগুন জ্বলছে। গত চার দিনেও আগুনের তীব্রতা কমেনি, বরং বাড়ছে। আগুনের তাপ ও গ্যাসের গন্ধ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থলের চারদিকে ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবলয় তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। ১৪৪ ধারা জারি করে লাল পতাকা টাঙানোর পাশাপাশি কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ চলছে। সেখানে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের একাধিক দল অবস্থান করছে।
জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামসুল আলম জানান, কয়েক দিন ধরে আগুন জ্বলছে। বরং এর তীব্রতা বাড়ছে। মাঝেমধ্যে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা যাচ্ছে। আশপাশের কিছু স্থানে মাটিও সরে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় এলাকায় ভূমিধস ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি দল সার্বক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করবেন।
আরও পড়ুন
তিন চাকার যান বন্ধের দাবিতে বরিশালের ৬ রুটে বাস চলাচল বন্ধ ১৬ ঘণ্টা আগে
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের চারপাশে ১৪৪ ধারা জারি করে ২০০ মিটার এলাকা কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও করা হচ্ছে। ঝুঁকি এড়াতে এলজিইডি সড়কটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিকল্প পথে চলাচলের জন্য স্থানীয়দের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, ছোট ইনানীর ছোট খাল এলাকায় নলকূপ থেকে গ্যাস উদগিরণের স্থান ও আশপাশে যেকোনো সময় বিস্ফোরণ কিংবা ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও আগন্তুকদের নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
শ্রমিক আন্দোলনে নাশকতার অভিযোগে নিষিদ্ধ আ.লীগের ২৮ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার ১৮ ঘণ্টা আগে
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ইনানীতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাব্য মজুতের খবর কক্সবাজারসহ দেশের জ্বালানি খাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের উপস্থিতি বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে প্রাথমিক আলামতকে আবিষ্কারের চূড়ান্ত ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ, ভূতাত্ত্বিক জরিপ এবং পরবর্তী অনুসন্ধানের মাধ্যমেই জানা যাবে সেখানে প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে।
সম্ভাব্য গ্যাসের উৎস শনাক্তের পাশাপাশি বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে আগুন নিয়ন্ত্রণ, গ্যাসের নির্গমন পর্যবেক্ষণ এবং আশপাশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।